শিরোনাম

জামায়াতে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে কোন্দল

নিজামীর স্ত্রীর পছন্দ শফিকুর-রফিকুল

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম   |  ১২:৩৬, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৯

নতুন নেতৃত্বের প্রস্তুতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে। আমির হিসেবে আলোচনায় রয়েছে দুইজন, সেক্রেটারি জেনারেলে তিনজন। দলটির নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান পরবর্তী আমির হিসেবে সবার পছন্দের তালিকায় থাকলেও একটা অংশের আপত্তিতে ইতোমধ্যে তিনি ছিটকে পড়েছেন। তবে এখন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানকে আমির নির্বাচন করতে বড় অংশের আপত্তি না থাকলেও সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচন নিয়ে কোন্দল চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর স্ত্রী শামসুন্নাহার নিজামি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনরা চাচ্ছেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানই হবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।

আবার ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ বড় একটি অংশ চাচ্ছে যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারকে সেক্রেটারি জেনারেল করতে। এ দুইজন ছাড়াও তরুণদের বড় অংশের চাহিদা জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, শিবিরের সাবেক সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকেই যেন সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচন করেন।

তবে মতিউর রহমান নিজামীর স্ত্রী শামসুন্নাহার নিজামি যেহেতু চাচ্ছেন জামায়াতের পরবর্তী আমির হবেন ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল হবেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, সেহেতু এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন দলটির সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাধর নেতারা। এ দুজনই এখন জামায়াতের আগামী নেতৃত্বের হাল ধরবেন। তবে সংকটে পড়তে পারেন তাহের। অসম্মানিত হলে তিনি জামায়াত ছেড়ে দিতে পারেন।

দীর্ঘ সময় শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মকবুল আহমাদ দলটির দুঃসময়ে হাল ধরেছিলেন। এখন তার বয়স হয়েছে। অসুস্থও বটে। তাই তিনি স্বেচ্ছায় ছুটি চাচ্ছেন। দলটির কেন্দ্রীয় এক নেতার ভাষ্য, মকবুল আহমাদ তার দীর্ঘ নেতৃত্বে মুখে যা বলেছেন, বাস্তবেও তা করার চেষ্টা করেছেন। কথা ও কাজে যার মিল খুঁজে পাওয়া যেতো সব সময়, যার প্রতিটি কাজ ডায়েরিতে লিখিতভাবে থাকতো। দাওয়াত পৌঁছানোর সমস্ত ছোটবড় অনেকেরই তালিকা থাকতো তার কাছে। সুন্দর নিয়মের ছকে বাঁধা জীবন। এমন নেতাকে বিদায় দিলে জামায়াত শূন্যতায় পড়বে। তবুও বয়সের কথা চিন্তা করে তাকে বিদায় দিতে হচ্ছে।

যদিও তিনি ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৃতীয় আমির হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৩ থেকে তিনি জামায়াতের অন্যতম নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এখন তার আবদারের কারণেই তাকে ছুটি দিয়ে নতুন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, আগামী নভেম্বরেই জামায়াতের নির্বাচন সম্পন্ন হবে। যদিও সিলেকশনেই নেতা ঠিক করা রয়েছে এখন নিয়ম রক্ষার একটা নির্বাচন হবে। সারা দেশে দলটির রোকন যারা রয়েছেন তাদেরই শুধু ভোট দেয়ার ক্ষমতা থাকবে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে গতমাস থেকে বড় কোন্দল চলছে। ৭১ এর ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের অবস্থান নিশ্চিত করা, মেধাকে অগ্রাধিকার দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী থেকে প্রভাবমুক্ত করা, ব্যবসার নামে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে জনশক্তির লাখ লাখ টাকা ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা, বিভিন্ন এনজিওর টাকা প্রকৃত কাজে ব্যবহার করা, বিশ্ববিদ্যালয়কে গুরুত্ব দেয়া, নেতৃত্ব নির্বাচনে জনশক্তির ভোটের আমানত রক্ষা করাসহ বিপর্যয়ের কারণগুলো সমাধান করা।

দলের বড় একটি অংশের অভিযোগ, এখন মতিউর রহমানের স্ত্রীর সিদ্ধান্তে ডা. শফিকুর-রফিকুল ইসলাম নেতৃত্বে এলে এগুলোর সমাধানের সম্ভাবনা খুবই কম থাকবে। কেননা ৭১-এর ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের তরুণ নেতারা স্টেটমেন্ট চেয়েছিলো। কিন্তু মতিউর রহমান স্ত্রীর কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। দলে শামসুন্নাহার নিজামির স্পষ্ট ঘোষণা— কোনো ধরনের স্টেটমেন্ট দেয়া হবে না। এছাড়া দলে মাদ্রাসা শিক্ষা বনাম আধুনিক শিক্ষার যে লড়াই চলছে এটা খান গ্রুপের কারণেই হচ্ছে। খানরা চায়, মাদ্রাসার শিক্ষিতরা দলের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেবে। অন্য শ্রেণিরা কৌশলে দূরে থাকবে।

অভিযোগ রয়েছে, সামপ্রতিক সময়ে কিছু নেতা জামায়াতের অর্থে ঘনঘন দেশের বাইরে যান। আর এই সুযোগটা পান যারা রফিকুল ইসলাম খানের পছন্দের। জামায়াতের অনেক নামে-বেনামের কোম্পানিগুলোর সব খোঁজ রাখেন খান। সোনার বাংলা ফাউন্ডেশনসহ কোটি টাকার প্রজেক্ট খান সিন্ডিকেটই নিয়ন্ত্রণ করে। এখন দেশের বাইরে নেতৃত্ব নির্বাচনও মতিউরের স্ত্রীর পছন্দের দুই লোকের সিদ্ধান্তে হয়। শুধু খানই নয়, ডা. শফিকও প্রতিটি জনপদে বিভাজন সৃষ্টি করছেন বলেও অভিযোগ উঠছে। দেশে এবং প্রবাসে সবখানেই এখন শফিকুর আর খানের প্রভাব।

জানা যায়, দক্ষিণ কোরিয়ায় গত সপ্তাহে জামায়াতের কমিটি দেয়া হয়। সেখানে সবার ভোটে যিনি সভাপতি হয়েছিলেন তার নাম মঞ্জুর এলাহী। পরবর্তীতে তাকে আর পদ দেয়া হয়নি। শফিকুর নিজের পছন্দ অনুযায়ী কমিটি ঘোষণা করেছেন। ইলেক্টেড সভাপতিকে পদ না দিয়ে পদ দেয়া হয়েছে ফেরদাউস খান নামের একজনকে। দলে এখন শফিকুরের আরেক নাম হচ্ছে বিশৃঙ্খলার জন্মদাতা হিসেবে। সমপ্রতি জামায়াত নেতা মতিউর রহমান আকন্দ, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেনকে দেশ ছাড়া করেছেন শফিকুর। দলের এই দুঃসময়ে মতিউর রহমান আকন্দ, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন যখন সবার কাছে প্রিয়মুখ হয়ে উঠছে ঠিক তখনই তাদের কৌশলের কথা বলে ব্যরিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের ন্যায় দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

জামায়াতের নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ আমার সংবাদকে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জামায়াতের নির্বাচন খুব শিগগিরই হবে, নভেম্বরেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ভোটের মাধ্যমেই আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হবেন।

এ বিষয়ে মহানগরের আরেক নেতার কাছে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মহানগরের সব কমিটি ডা. শফিকুর রহমান ও রফিকুল ইসলাম খানের পছন্দ অনুযায়ী হচ্ছে। ইলেকশনের ভোটের নেতাকে বাদ দিয়ে তারা সিলেকশনের নেতা ঘোষণা করেন। জামায়াতে এখন ভোট হয় তবে নেতা হয় সিলেকশনে। আর এখন যেহেতু মতিউর রহমানের স্ত্রী চাচ্ছেন এই দুই নেতাই জামায়াতের নেতৃত্বে আসুক তাহলে এখন এই দুই নেতাই আসবে, অন্য কেউ আসার সুযোগ নেই বলেও মনে করেন তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত