শিরোনাম

ফের অশান্ত হতে পারে শিক্ষাঙ্গন

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ   |  ০১:৩২, অক্টোবর ০৮, ২০১৯

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও বুয়েট। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ইতোমধ্যে বিক্ষোভ শুরু করেছে শিক্ষার্থীরা। ঢাকার বাইরেও এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে এরই মধ্যে কর্মসূচি পালন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচি ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা বলছে, বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। ফলে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবারো অশান্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, বুয়েটের ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে গত রোববার রাতে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতারা। এ খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাবির রাজু ভাস্কর্য থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি ঢাবি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ শেষে বুয়েট ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়। এ সময় তারা ‘বিজেপির দালালরা; হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই; আবরার হত্যার ফাঁসি চাই’, ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হুঁশিয়ার সাবধান,’ ‘হলে হলে দখলদারিত্ব; বন্ধ কর, করতে হবে’, ‘সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ বলে স্লোগান দিতে থাকে। এই বিক্ষোভে প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজারো শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বিক্ষোভে অংশ নেন কয়েকজন শিক্ষকও।

হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদের বিচার দাবি করে বিক্ষোভকারীরা বলেন, আবরার হত্যার পেছনে ছাত্রলীগের অতিমাত্রায় ভারতপ্রেম প্রেরণা জুগিয়েছে। দেশপ্রেমিক আবরারের ভারতবিদ্বেষী স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে তাকে খুন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নূরুল হক নূর। প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশনসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

এদিকে, আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রগতিশীল বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী, সাধারণ শিক্ষার্থী ছাড়াও আওয়ামী-বিএনপি-বামপন্থি কয়েকজন শিক্ষকও অংশ নেন।

মানববন্ধনে বক্তারা প্রশ্ন তোলেন- শিবির করার জন্য কাউকে মেরে ফেলা যায় কিনা কিংবা ভারতের সমালোচনা করলে সেটা অপরাধ হয়ে যায় কিনা। এমন প্রশ্ন তুলে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী) জাবি শাখা সভাপতি মাহাথির মুহাম্মদ বলেন, আবরারের ফেসবুক পোস্টটি দেখেছি যার জন্য তাকে খুন করা হয়েছে। সে বাংলাদেশের সম্পদ ভারতের হাতে তুলে দেয়ার সমালোচনা করেছে, এটা কি তার অপরাধ ছিল? সে লিখেছে বাংলাদেশকে ভারত এক সময় তাদের সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয়নি। আজকে ভারতকে বাংলাদেশের দুই সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া হচ্ছে। তিস্তা ও পদ্মার পানি না পেয়ে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের মানুষ মরুভূমির জীবনযাপন করে। আবার বর্ষা মৌসুমে ভারত যখন বাঁধ খুলে দেয় তখন দেশের মানুষ বন্যায় ভাসতে থাকে। আজ একদিকে ফারাক্কা খুলে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে আর ওইদিকে ফেনী নদীর পানি ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এই যে ভারত তোষণের নীতি, এই যে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, ভারতকে খুশি রেখে যে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়াস এই প্রয়াসের সমালোচনা করেছিল বুয়েটে আমাদের বন্ধু আবরার। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে তার এই অধিকার রয়েছে। কিন্তু বুয়েটে ছাত্রলীগ নামধারী রাষ্ট্রের পোষা সন্ত্রাসীরা তাকে এজন্য ডেকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য তাকে ওরা ডাকতেই পারে না। হত্যা করার পর তাকে শিবির হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে।

মাহাথির আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একমাত্র টেন্ডারধারী হয়ে উঠেছে এখন আ.লীগ। পাকিস্তান আমলে যেমন শাসকের সমালোচনা করলে তাকে কম্যুনিস্ট বলা হতো; ভারতের দালাল বলা হতো, আজকে বাংলাদেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সমালোচনা করলে তাকে শিবির আখ্যা দেয়া হয়।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী কাব্য কৃত্তিকা বলেন, একজন মানুষকে তার আদর্শিক পরিচয়ের কারণে মেরে ফেলা যায় না। সে যদি শিবির করে আর শিবির করা যদি ঘৃণ্য হয় তাহলে দেশে আইন আছে। আইন তার বিচার করবে। একজন মানুষ সে যেকোনো আদর্শেরই হোক না কেন নাস্তিক বা শিবির বলে তাকে হত্যা করা জায়েজ হতে পারে না।

শাখা ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সুস্মিতা বলেন, আজকে বাংলাদেশ যে ভারত তোষণ নীতিতে চলছে, নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায় না করে ভারতকে সবকিছু দিয়ে দিচ্ছে। ভারতের দুটি রাজ্য যখন কোনো বিনিময় ছাড়া একে অপরকে কিছু দিতে রাজি হয় না সেখানে বাংলাদেশ কোনো বিনিময় ছাড়া ভারতকে আমাদের সমস্ত সম্পদ তুলে দিচ্ছে। এই নতজানু নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে আবরার খুন হয়েছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে সমস্ত জাতি তাকিয়ে থাকে যে এখান থেকে জাতির ভবিষ্যৎ মাথারা বের হবেন সে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন এমন নৃশংস খুন হয়, তখন আমাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না বাংলাদেশ কী অবস্থায় রয়েছে। এই খুন শুধু বুয়েটের বিষয় নয়, সারা দেশের মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ খুনের বদলা নেবে।

জাহঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আশিকুর রহমান বলেন, লক্ষ শহীদের রক্তে কেনা এমন এক স্বাধীনতা আমরা পেলাম যেখানে মুক্ত চিন্তার কোনো দাম নেই। আজ শিবির সন্দেহ হওয়ায় আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমার প্রশ্ন এই অধিকার তাদের কে দিয়েছে?একই দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ব্যানারে দুপুরে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিকালে সড়ক অবরোধ ছাড়াও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে শতশত শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে প্রতিবাদী স্লোগান দিতে থাকে।

শিক্ষার্থীরা বলেন, দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে অধিকারের কথা বলা অন্যায় নয়। কিন্তু ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা একটি নিরীহ ছাত্রকে এই অপরাধে পিটিয়ে হত্যা করেছে। ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে এ যুগে হত্যার মতো ঘটনা ঘটতে পারে তা অবিশ্বাস্য। কিন্তু এখন তাই ঘটছে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

আবরার ফাহাদকে হত্যার প্রতিবাদে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে অনুষ্ঠিত অবরোধের সময় ‘শিক্ষা, সন্ত্রাস একসাথে চলে না’, ‘আমার ভাই কবরে, সন্ত্রাসীরা বাইরে’, ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ এমন বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করলেও এ সময় শিক্ষার্থীরা অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পরিবহনগুলো চলাচলের ব্যবস্থা করে দেয়। এছাড়াও, মশাল মিছিল করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, বিক্ষোভ করেছে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। বিক্ষোভ হয়েছে চট্টগ্রামেও।

এদিকে, ঢাকার বাইরের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়েও কর্মসূচির প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। পূজার ছুটি থাকায় তাৎক্ষণিক কর্মসূচি ঘোষণা করতে না পারলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী।

আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নূরুল হক নূর। তিনি বলেছেন- স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল সাধারণ শিক্ষার্থী ভাই-বোন, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী, সমর্থকদের প্রতি জোরালো অনুরোধ আপনারা বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে সবাই সোচ্চার হোন। দেশবিরোধী চুক্তির সমালোচনা করায় শিবির অপবাদ দিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো নির্মম-নৃশংসতার পরও কি চুপ থাকা যায়? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ছাত্রঐক্য গড়ে তুলুন।

তবে আবরার হত্যার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করলেও ক্যাম্পাস অশান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে দাবি করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর লুৎফর রহমান। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, এ হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে কয়েকজন আটক হয়েছে। হত্যার প্রতিবাদে আমাদের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ-অবরোধ করলেও ক্যাম্পাস অশান্ত হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইতোমধ্যে একাধিক ক্যাম্পাসে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার যদি হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় না আনে তাহলে বিক্ষোভ অন্যান্য ক্যাম্পাসেও দৃঢ় হতে পারে। আর আন্দোলন হলে পরিস্থিতি শান্ত রাখা কঠিন হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক আমার সংবাদকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ছাত্র হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বুয়েট, ঢাবির পাশাপাশি অন্যান্য ক্যাম্পাসও অশান্ত হতে পারে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত হবে দ্রুত জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা।

উল্লেখ্য, ফেসবুকে ভারত-বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস দেয়ায় রোববার দিবাগত রাতে বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত একটি কক্ষে নির্যাতন করা হয় আবরার ফাহাদের ওপর। পরে সাধারণ ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফাহাদকে হলের দ্বিতীয় তলা থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যায়। গতকাল সকাল সাড়ে ৬টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত