শিরোনাম

প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ  |  ০১:৩৩, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

*ছাত্রলীগ ফ্যাসিবাদী রাজনীতি করছে: মাহমুদুর রহমান মান্না (সাবেক ভিপি ডাকসু)
*নিষিদ্ধের পক্ষে কথা বলতে পারি না: লেখক ভট্টাচার্য (ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রলীগ)
*লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে: নুরুল হক নুর (ভিপি, ডাকসু)
*নিষিদ্ধ হলে প্রশাসন স্বৈরতান্ত্রিক হবে: সালমান সিদ্দিকী(সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফ্রন্ট)
*ছাত্র রাজনীতি চাই তবে অপরাজনীতি না: ফয়েজ উল্লাহ (সভাপতি, ঢাবি ছাত্র ইউনিয়ন)

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীনতাপূর্ব থেকেই ছাত্র রাজনীতির চর্চা চলে আসছে। দেশ বিভাগের পর বিভিন্ন বাম সংগঠনের পাশাপাশি ইসলামী ভাবধারার রাজনীতিও সক্রিয় ছিলো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ছাত্র রাজনীতি ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ছাত্র রাজনীতির স্বর্ণালি সময় চলছে। তবে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটেছে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা।

এ তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। ফেসবুকে ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস দেওয়ায় তাকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ পরিস্থিতিতে দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এমনকি বুয়েটের ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশকও বলেছেন ক্যাম্পাসে দলভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক। একই দাবি জানিয়েছেন বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতিও।

তবে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িতরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিতে পারছেন না। তারা বলছেন, ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের মতো সময় এখনো তৈরি হয়নি। বরং ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারলে এমন ঘটনা এড়ানো যেতো। আবরার হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের ফাঁসির দাবি জানানোসহ ৮ দফা দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এই দাবিগুলোর একটি হলো— ক্যাম্পাসে নোংরা ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের এই দাবির সাথেই একমত পোষণ করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের দেশে বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হয় না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি থাকার প্রয়োজন আছে। বুয়েটেও কোনো ধরনের ছাত্র রাজনীতি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাঝে গিয়ে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

একই কথা বলেছেন বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ। শিক্ষার্থীদের সাত দফা দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে আবরার হত্যার বিচারের পক্ষে জোরালো দাবি জানান তিনি। বলেন, বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা দরকার।

তবে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা চাইলেই ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সময় আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক ও বর্তমান ছাত্র নেতারা। তারা বলছেন, ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থান থাকলে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটতো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টিকে নিন্দনীয় ও ধান্দাবাজি বলে দাবি করেছেন। তিনি করে বলেন, ক্যাম্পাসে সব রাজনৈতিক দলের সহাবস্থান থাকলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এমনকি কোনো অন্যায় করতেও সাহস পেতো না নির্দিষ্ট কোনো ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

তিনি আরও বলেন, এখনতো ক্যাম্পাসে রাজনীতি নেই। ছাত্রলীগের একক দখলবাজি চলছে। ফ্যাসিবাদী রাজনীতির চর্চা করছে তারা। বিরোধী মতের একটি ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজ করতেও তারা দ্বিধা করছে না। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ কোনো সমাধান নয়।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, আমি একজন ছাত্র রাজনীতির প্রতিনিধি হিসাবে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে কোনোভাবেই কথা বলতে পারি না। ছাত্রলীগের ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ছাত্রলীগ যে কোনো গণতআন্ত্রিক আন্দোলনে সকল জাতির স্বার্থে অবদান রেখেছে। ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি তারা করতে পারে; যাদের নিজের স্বার্থে আঘাত লাগে। ছাত্র রাজনীতির প্রধান হিসেবে আমি আসলে এ বিষয়ে একমত হতে পারি না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নূর বলেন, ছাত্র রাজনীতি দেশের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু আজকে কেন ২০১৯-এ এসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি আসবে দেশের একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে? এর কারণ একটিই। তা হচ্ছে ছাত্ররাজনীতি তার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস হারিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা দেখছি ৯০ পরবর্তী সময়ে পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতি চালু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। যে কারণে আজকে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে। স্বৈরশাসকের সময়ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হয়ে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতো। অথচ ৯০ পরবর্তী সময়ে আমরা দেখি তথাকথিত গণতন্ত্রের মুখোশে স্বৈরতান্ত্রিক আরেক সরকার ব্যবস্থায় যারা আসলো তারা ছাত্রদের পরিচ্ছন্ন রাজনীতিকে বন্ধ করতে সুশৃঙ্খলভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রেখেছিল। সেই কারণেই যখন যে দল ক্ষমতায় থেকেছে তারাই ছাত্র সংগঠনগুলোর উপর কর্তৃত্ববাদ চালিয়েছে। যা এখনো চলছে। যে কারণে প্রতিটা ক্যাম্পাসে এক অরাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই আজ বুয়েটের মতো সর্বোচ্চ মেধাবী প্রতিষ্ঠানের ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলছে।

নুর বলেন, আমি মনে করি, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ না করে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মতামত আছে। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব মতামত দিয়েছে। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি দাবি করলে সেটা নিয়ে আমি ওইভাবে বিরূপ মন্তব্য করব না। তবে তারা রাজনৈতিক সংগঠন নয় বরং যারা লেজুড়বৃত্তি রাজনীতি করে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করা উচিত।

ছাত্র ফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, বুয়েটের সকল শিক্ষার্থীরা এ দাবি আসলে করে নাই। বাংলাদেশের অতীত সকল গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১ সাল পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির অসাধারণ অবদান দেখিয়েছে। ছাত্র রাজনীতি যদি না থাকে তাহলে ছাত্রসংগঠন থাকবে না। নিষিদ্ধ কোনো সমাধান নয়। তবে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে রাজনীতির নামে অপরাজনীতি চালাচ্ছে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই সঠিক রাজনীতি। যদি ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বৈরতান্ত্রিকভাবে অনেক কিছু করার সুযোগ পাবে। যেটা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়।

তিনি আরও বলেন, নিশ্চয়ই ছাত্রলীগ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। আবরার ফাহাদের হত্যার বিষয়টা আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আমরা যেটা বলতে চাই, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী সংগঠন রাজনৈতিকভাবে সামাজিকভাবে সকল দিক থেকে বয়কট করুন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে প্রশাসনের জন্য বড় সুযোগ হয়ে যাবে। এখন শিক্ষার্থীরা আবরার হত্যার প্রতিবাদে মাঠে রয়েছে তখন ছাত্র রাজনীতি না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ধরনের মোমবাতি দেবে না। আমরা ছাত্ররা ছাত্র রাজনীতি চাই; তবে অপরাজনীতি বা অপশক্তি চাই না।

উল্লেখ্য, ফেসবুকে ভারত-বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ায় রোববার দিবাগত রাতে আবরার ফাহাদ নামের এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতারা। এ হত্যার বিচার দাবিতে ৮ দফা দাবিতে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের জোরালো দাবি জানানো হয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত