শিরোনাম

লাপাত্তা ক্যাসিনোর প্রধান কারিগর কৃষ্ণা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০২:১৮, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

রাজধানীতে ক্যাসিনো জুয়ার বোর্ড পরিচালনায় জড়িত তালিকাভুক্ত নেপালি নাগরিকদের সন্ধান এখনো করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই পালিয়ে যাওয়া ১৩ নেপালি ছাড়াও চীন ও নেপালের প্রায় চার শতাধিক তরুণ-তরুণী ঢাকার বিভিন্ন ক্যাসিনোতে কয়েক শিফটে কাজ করতেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যালিজ এন্টারটেইনমেন্ট নামক একটি আন্তর্জাতিক ক্যাসিনো জুয়া সংস্থার সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন নেপালি নাগরিক কৃষ্ণা সারথী। তার অন্যতম সহযোগী ছিলেন দিনেশ ও রাজকুমার। নেপালি নাগরিক কৃষ্ণা সারথীর বিপুল পরিমাণ ভিজিটিং কার্ড মতিঝিলের মোহামেডান ক্লাবের জুয়ার বোর্ডে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। মতিঝিলে অভিযানের পরপরই তিনি তার সহযোগী হেমন্ড সাহা, প্রসয়ন প্রবীণ, সিধাই নিরোজ, ড্যাঙ্গল বিকাশ নান, নাকর্মি গৌতম, রণজিৎ বচ্চন ও নয়াজি শেরেস্তাকে নিয়ে গা ঢাকা দেন।

সূত্র জানায়, ট্যুরিস্ট ভিসায় আসা এসব তরুণ-তরুণীরা সুশিক্ষিত, আর তাদের চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ ছিল। নেপালিরা বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী। এদের ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দেয়া হতো। আর জুজু কেলা বা ক্যাসিনোয় পোকা, কার্ডসট মেশিনের খেলা ছাড়াও বাজি ধরে তাস খেলা বা বাক্কারাট খেলতো। আবার রুলেট, পন্টুন, ফ্লাশ, বিট, ডিলার, কার্ডসট, ব্লাকজ্যাক নামের জুয়া খেলায় পারদর্শী।

তাছাড়া রেমি কাটাকাটি, নিপুণ, চড়াচড়ি, ডায়েস, ওয়ান-টেন, ওয়ান-এইট, তিন তাস, নয় তাস, ফ্লাশ-জুয়া খেলায় পারদর্শী ছিলো। মতিঝিলের ইয়ংমেন্স ক্লাবে গত ১৮ সেপ্টেম্বর র্যাবের অভিযানের পরপরই তারা গা ঢাকা দেয়। এরপর কতিপয় পুলিশের সহযোগিতায় এদের অধিকাংশই বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরা ক্যাসিনো বোর্ডে রিসিপশনিস্ট, কেউ ইলেক্ট্রনিক জুয়ার বোর্ড অপারেটিং, কেউ নিয়োজিত ছিলেন ক্যাসিনো থেকে অর্থপাচার কাজে।

আর ক্যাসিনোতে আসা জুয়ারিদের মনোরঞ্জনের জন্য আনা সুন্দরী গার্লদের রাজধানীর গুলশান, নিকেতন, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরা, পল্টন, ফকিরাপুল, শাহজাহানপুর, শাহবাগ থানার সেগুনবাগিচা ছাড়াও বিভিন্ন এলাকার প্রাসাদোপম ভবনে রাখা হতো বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে। তবে ঢাকায় ক্যাসিনোকাণ্ডে যুক্ত নেপালিদের অবস্থান এখনো জানতে পারেনি আইনশৃঙখলা বাহিনী। তারা ধারণা করছেন, মতিঝিলে অভিযানের পরপরই তারা দেশের সড়কপথে সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়ে গেছেন। ব্যালিজ এন্টারটেইনমেন্ট নামের একটি আন্ত্তর্জাতিক জুয়া পরিচালনা কোম্পানির কর্মচারী বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত রাজধানীর ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র ও বনানীর ঢাকা গোল্ডেন ক্লাবের অবৈধ ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে সিলগালা করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আর ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের সভাপতি ও যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেপ্তারের পর সকল ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত নেপালিরা পালিয়ে যায়।

তবে ঘটনার দিন রাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীর সেগুনবাগিচাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। কিন্তু তাদের কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করতে পারেনি। আর ১৩ জন নেপালিকে পালিয়ে যাওয়ার সহযোগিতা করার অভিযোগে রমনা থানার কনস্টেবল দীপঙ্কর চাকমা ও ডিএমপির প্রতিরক্ষা বিভাগের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) গোলাম হোসেন ওরফে মিঠুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সূত্র জানায়, নেপালিদের ভারতে যেতে কোনো পাসপোর্ট ও ভিসার প্রয়োজন হয় না। এজন্যই তারা র্যাবের অভিযানের পর সেই সুযোগ নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়েছেন। তাদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। আর সেগুনবাগিচা থেকে পালিয়ে যাওয়া নেপালিদের সিসিটিভির ফুটেজসহ ছয়জনের ছবিযুক্ত পাসপোর্ট গোয়েন্দারা পেয়েছে।

অপর এক সূত্র জানায়, রাজধানীর ক্যাসিনোগুলোতে ২০০-র বেশি ক্যাসিনো গার্ল ছিল। এদের মধ্যে ৭০ থেকে ৯০ জন জুয়ার বোর্ড অপারেটিংয়ে পারদর্শী ছিল। আর অন্যরা বিভিন্ন কাজে পারদর্শী ছিল। প্রতিদিনই পাঁচজন ক্যাসিনো গার্ল ও পাঁচজন ক্যাসিনো বয় ব্যাগে করে ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলার নেপালে নিয়ে যেতেন। সেখান থেকে সব টাকা একত্রিত করে হুন্ডির মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে পাচার করা হতো। এ কাজে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী ছিলো নেপালি তরুণী সোয়েতা ও কামালা। আর পুরুষদের মধ্যে বিজে ছিল অন্যতম। বাংলাদেশের সুন্দরী তরুণী নিশিতা ও আলম সরকার হুন্ডির মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে টাকা পাচার করতো। ক্যাসিনো বাণিজ্যের মূলহোতা নেপালের বাসিন্দা দিনেশ, হেমন্ড সাহা. রাজকুমার ও কৃষ্ণা সারথী। ক্যাসিনোগুলোয় চীন থেকে আনা কার্ড সাপ্লাই দেয় মতিঝিলের ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হেমন্ড সাহা। তিনিও নেপালি।

সূত্র জানায়, হিমালয়ের দেশ হিসেবে নেপাল পর্যটনে সুপরিচিত। এই পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করেই নেপালে গড়ে উঠেছে ক্যাসিনো। নেপাল দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ যেখানে বৈধভাবে ক্যাসিনো চালু করা হয়েছে। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ৯টি এবং রাজধানীর বাইরে দুটি ক্যাসিনো রয়েছে। ক্যাসিনো পরিচালনায় নেপালিরা অত্যন্ত পারদর্শী। এজন্য শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারত, শ্রীলংকা, তাইওয়ান, আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে।

আরেক সূত্র জানায়, রাজধানীতে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে শতাধিক বিদেশি নারীর তালিকা পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদের মধ্যে বেশিরভাগই নেপালের নাগরিক। আর ভারত-চীন ছাড়াও মিয়ানমারের নাগরিকও ছিলেন। র‌্যাবের অভিযানের পরপরই ওই নারীরা বাসা ছেড়েছেন। তারা বিভিন্ন বিউটি পার্লারে চাকমা নারীদের সঙ্গে মিশে চাকরি করছেন। আর অনেক নেপালি আত্মগোপনে। তাদের ধরতে র‌্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। এ বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারওয়ার বিন কাশেম বলেছেন, ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বিদেশি এবং তাদের সহায়তাকারীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত