শিরোনাম

ফেনী নদী থেকে বাড়তি পানি নেয়ার আশঙ্কা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম   |  ০১:১১, অক্টোবর ১০, ২০১৯

*বিশ্লেষণ ছাড়া পানি দেয়ার যৌক্তিকতা নেই: শরীফ জামিল যুগ্ম সম্পাদক, (বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন)
*চুক্তির বেশি চুরি করলে বিপর্যয় আনবে: মোহাম্মদ এজাজ (নদীবিষয়ক বিশ্লেষক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক)
*নদীর স্বাস্থ্য বিবেচনা করা উচিত ছিলো: ড. একেএম সাইফুল ইসলাম (বুয়েটের ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের প্রফেসর)
*পানি নিলে ব্যাঘাত ঘটবে এটাই স্বাভাবিক: অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার (চেয়ারম্যন, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ-স্টামফোর্ড)

১০ বছর পর বৈধভাবে ভারতে যাচ্ছে ফেনী নদীর পানি। যদিও দীর্ঘ সময় অনুমতি ছাড়াই ফেনী নদী থেকে পানি নিয়ে যেতো দেশটি। অবশেষে ঢাকা-নয়াদিল্লির মধ্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়।

এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ভারতকে ‘অত্যন্ত নগণ্য’ পরিমাণ পানি দেয়া হচ্ছে। তবে বিপর্যয়ের কথা জানিয়েছেন, পানি গবেষক ও পরিবেশ বিশ্লেষকরা।

তাদের ভাষ্য, ভারত সারা বছর অনুমতি ছাড়াই এ দেশ থেকে পানি নিয়ে যাওয়ার খবর তাদের কাছে রয়েছে। চুক্তিতে যা উল্লেখ আছে সেই পরিমাণ পানি নিলে হয়তো কোনো ক্ষতি হবে না। তবে এর বেশি পানি তারা গোপনে তুলে নিলে ফেনীসহ আশপাশের অঞ্চলের জন্য ভয়াল বিপর্যয় ডেকে আনবে। ফেনী নদীর পানি কমে গেলে অন্য নদীগুলোতেও পানি প্রবাহ কমে যাবে। যার কারণে ফেনী নদীর সাথে সাথে হুমকির মুখে পড়বে এসব নদীর জীব-বৈচিত্র্য এবং এর স্থানীয় বাসিন্দারাও এর খেসারত দিতে হবে।

তাই বিশ্লেষকরা মনে করেন, নদী বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নদীর পাড়ের মানুষ, আশপাশের মানুষের ভবিষ্যতে নৈতিক প্রভাব কি পড়তে পারে তা নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ করা হয়নি। বিশ্লেষণ কিংবা সমীক্ষা ছাড়া পানি দেয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়। নদীর পানি স্থানান্তরের আগে অবশ্যই এর স্বাস্থ্য বিবেচনা করা উচিত ছিলো। তাহলে বুঝা যেতো কতটুকু পানি দেয়া যাবে। শুধু ফেনী নদী না সবগুলো নদীর ক্ষেত্রে নদীর স্বাস্থ্য যেন ঠিক থাকে তা মাথায় রাখতে হবে। কারণ নদীর পানি দিয়ে আশপাশের মানুষ চলে। এই পানির সাথে জীবিকা নির্ভরশীলও। এই পানি আমাদের খাবারের কাজে প্রয়োজন হয়। কারণ পানি কমে গেলে লবণাক্ত বেড়ে যাবে। মাছসহ পানির উপর নির্ভর যেসব প্রাণী আছে তাদের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক শরীফ জামিল আমার সংবাদকে বলেছেন, ফেনী নদীর পানি কাউকে দেয়া ঠিক হয়নি। কারণ আগে নদী বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নদীর পাড়ের মানুষ, আশপাশের মানুষের ভবিষ্যতে নৈতিক প্রভাব কি পড়তে পারে তা নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ করা হয়নি। বিশ্লেষণ ছাড়াই এভাবে পানি দেয়ার কোনো যুক্তি নেই। কারণ এদেশের মানুষ এখনো খাবারের পানি পায় না, আমরা কেন অন্যকে গোসল করার পানি দেব। বাংলাদেশের সীমানায় ভারতের প্রায় ৫৪টি নদী রয়েছে। সেগুলো নিয়েও আমাদের কাজ করার উদ্যোগ নিতে হবে। ভবিষ্যতে এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না। যদিও আমাদের এই দেশ ভাটির দেশ। আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে আমাদের পানি যদি উদ্বৃত্ত থাকে তাহলে আমরা দিতে পারি অন্যথায় নয়।

নদীবিষয়ক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক মোহাম্মদ এজাজ আমার সংবাদকে বলেন, চুক্তিতে উল্লেখ হওয়া যে পরিমাণ পানি ভারত আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যাবে তা খুবই কম। তবে আমরা দেখেছি ভারত সারাবছর অনুমতি ছাড়াও পানি চুরি করে নিয়ে যায়। চুরি করার পর শীতকালেও ৫৫ থেকে ৬০ কিউসেক পানি আমরা পেয়ে থাকি। তাই বলবো যেটুকু পানি নেবে সেটুকু নিলে কোনো সমস্যা নেই। তবে ভারত যদি চুক্তির বেশি পানি নেয়, অনুমতি ছাড়া কিংবা চুরি করে তাহলে সেটি আমাদের জন্য ভয়াল বিপর্যয় ডেকে আনবে। কারণ এটি এখন বলার অপেক্ষা রাখে না ভারত সব সময় অনুমতি ছাড়াই আমাদের অন্য যেসব নদী আছে সেগুলো থেকে পানি চুরি করে নেয়। ফেনী নদী থেকে তো অনেক আগ থেকেই তারা পানি নিচ্ছে। কোনো চুক্তি ছাড়াই। এগুলো তো আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি। তাই বলবো অতিরিক্ত পানি নিয়ে নিলে বাংলাদেশে ভবিষ্যতে সংকট দেখার সম্ভাবনা অনেক বেশি রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, আসলেই পানির সাথে দুটো দিক আছে। একটি হচ্ছে- খাবারের পানি, অন্যটি চাষের পানি। এমনিতেই মাঝেমধ্যে পানির স্তর কমে যায়। যদিও আমাদের এখানে ভালো। সর্বনিম্ন ১১০ কিউসেক পানি থাকে আর বর্ষাকালে তা ৭৫০ কিউসেক এর উপরে থাকে। তাই বলবো- পানি নিয়ে ভারতের সাথে যে চুক্তি হয়েছে যদি ঠিক থাকে এবং তারা সেটুকু পানি নেয় হয়তো কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু যদি এর বেশি পানি তুলে নেয় তাহলে ক্ষতি হয়ে যাবে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের ফেনী নদী, তিস্তা, ধরলা, মুন্নু, মুহুরীসহ প্রায় অনেকগুলো নদী আছে। এই নদীগুলো থেকে কিংবা ফেনী নদী থেকে সমীক্ষা ব্যতিত পানি দেয়া খুব একটা গ্রহণযোগ্য হবে না। সবমিলিয়ে বলবো নদীর পানি স্থানান্তরের আগে অবশ্যই স্বাস্থ্য বিবেচনা করা উচিত ছিলো। তাহলে বুঝা যেতো, কতটুকু পানি দেয়া যাবে। শুধু ফেনী নদী না সবগুলো নদীর ক্ষেত্রে নদীর স্বাস্থ্য ঠিক থাকে তা মাথায় রাখতে হবে, নদীকে মরতে দেয়া না।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার আমার সংবাদকে বলেন, নদীকে নদীর মতো চলতে দিতে হবে। এর উপর চাপ প্রয়োগ করা ঠিক হবে না। এটি আমাদের অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। কেউ যদি পানি তুলে নেয় তাহলে অবশ্যই এর ব্যঘাত ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। এই নদীর পানি দিয়ে আশপাশের মানুষ চলে। এই পানির সাথে জীবিকা নির্ভরশীলও। এই পানি আমাদের খাবারের কাজে প্রয়োজন হয়। চাষের কাজে প্রয়োজন হয়। সেই পানি এখন যদি অন্যকে দেয়া হয় তাহলে এর একটা নৈতিক প্রভাব থাকে এবং এখন এর প্রভাব দৃশ্যত না হলেও ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়তে পারে এটাই স্বাভাবিক। তবে এটি বলবো তারা বর্ষাকালের পানি বর্ষাতে নিলে সমস্যা কম হবে। তারা যদি বর্ষাকালের পানি শীতকালে নিতে চায় তাহলে আশপাশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। কারণ পানি কমে গেলে লবণাক্ততা বেড়ে যাবে। মাছসহ পানির উপর নির্ভর যেসব প্রাণী আছে তাদের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়বে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত