শিরোনাম

মামলায় খেলাপি আদায়ে ধীরগতি

গত এক বছরে ৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ আদায়

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসিফ শওকত কল্লোল   |  ০৭:২৫, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর দায়ের করা মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে খুবই ধীর গতিতে। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায়ের চেয়ে খরচের পরিমাণ অনেক বেশি বেড়ে গেছে। মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ, আইনজীবীর সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগাযোগ, আইনজীবীর চাহিদা অনুযায়ী নথিপত্রের যোগান, জামানতের দখল বজায় রাখা- এসব খাতে খরচ বাড়ার কারণে মামলার পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। মামলার বিপরীতে খেলাপি ঋণ আদায় পরিস্থিতির উপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি একটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগগুলো মামলা করেছে দুই লাখ ৫৫ হাজার। এর বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত এক বছরে আদায় হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। মোট আটকে থাকা অর্থের মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আইনি জটিলতার কারণে সঠিকভাবে মামলা পরিচালনা হচ্ছে না, ঋণখেলাপির সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের গোপন আতাত, সঠিকভাবে ঋণ না দেয়ায় ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত জামানত থাকে না, রাজনৈতিক প্রভাব এসব কারণে মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে খুবই কম। আর মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এর বিপরীতে অর্থ আদায়ও হচ্ছে না।

এদিকে প্রতি বছরই নতুন করে হওয়া খেলাপি ঋণের বিপরীতে মামলা হচ্ছে। ফলে আদালতে খেলাপি ঋণের মামলার পাহাড় জমেছে। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বাণিজ্যিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থমন্ত্রণালয় ও আইন কমিশনের সমন্বয়ে গত জুনে একটি বৈঠক করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। ওই বৈঠকে আইনি কাঠামো আরও জোরদার ও স্পষ্টীকরণের সিন্ধান্ত হলেও এর বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য আইনি সংস্কার ও আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত একাধিক কমিটি কাজ করছে। তারা ইতোমধ্যে বেশকিছু সুপারিশও দিয়েছে। সেগুলো নিয়ে এখন কাজ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আরও ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণকে খেলাপি হিসাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। কিন্তু ব্যাংকগুলো এসব ঋণকে খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করেছিল। অবলোপন করা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ। এসব মিলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, এর বাইরে আরও অনেক খেলাপি ঋণ রয়েছে, যেগুলো খেলাপি হওয়ার যোগ্য হলেও ব্যাংকগুলো তা খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে না। এসব ঋণ থেকে ব্যাংক কোনো অর্থ আদায় করতে পারছে না। তারপরও এগুলোকে নিয়মিত দেখানো হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলোর দায়ের করা মামলার মধ্যে গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি হয়েছে। কৃষিঋণ নিয়ে যারা খেলাপি হয়েছেন তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে সার্টিফিকেট মামলা করে ব্যাংকগুলো। এখন পর্যন্ত সার্টিফিকেট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫৭ হাজারটি। অর্থাৎ মোট মামলার সাড়ে ৭৮ শতাংশই হয়েছে কৃষকের বিরুদ্ধে। এর বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ মাত্র ৫৩৩ কোটি টাকা। যা মোট অর্থের মধ্যে শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ। আর বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৯৮ হাজার মামলায় আটকে আছে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। মোট মামলার মধ্যে বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে হয়েছে ২২ শতাংশ। এর বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় শতভাগ অর্থাৎ ৯৯ দশমকি ৭৩ শতাংশ।

মোট মামলার মধ্যে অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন ৬২ হাজার ২০৪টি। এর বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। ৫২১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো দেউলিয়া আদালতে মামলার করেছে ১৬৫টি। ৪২ হাজার ৫৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে দেওয়ানি আদালতে ব্যাংকগুলোর ঝুলে আছে ৩৫ হাজার ৫১৪টি মামলা। এর বাইরে উচ্চ আদালতে পাঁচ হাজার ৩৭৬টি রিট মামলা রয়েছে। এসব মামলায় আটকে রয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা।

সব মিলে দুই লাখ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এসব মামলার বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের মধ্যে গত জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র পাঁচ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলোকে আইনজীবীদের ফি বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে সাত লাখ টাকা। অর্থাৎ সাত লাখ টাকা খরচে করে মাত্র পাঁচ হাজার কোটি ৪০০ টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। আদায় হয়েছে মাত্র ২ দশমকি ৭ শতাংশ।

একইভাবে গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ছয় মাসে ব্যাংকগুলো আদায় করেছে মাত্রা আট হাজার কোটি টাকা। ওই সময়ে আইনজীবীদের ফি বাবদ পরিশোধ করেছে সাড়ে ছয় লাখ টাকা। অর্থাৎ সাড়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করে আদায় করেছে মাত্র আট হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত