গুলিস্তানে অবৈধ দোকান স্থায়ী বরাদ্দের নামে বাণিজ্য

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০১:৩৭, অক্টোবর ১০, ২০১৯

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন ১১টি মার্কেট ও ভবনে তিন হাজার অবৈধ দোকান বরাদ্দে দুর্নীতির মাধ্যমে কোটিপতি বনে গেছেন। মার্কেটের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা, টয়লেট, সিঁড়ি, ফুটপাত, সড়কসহ বিভিন্ন স্থান দখল করে এসব দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। মার্কেটগুলোর নেতা ও ডিএসসিসির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বছরের পর বছর দোকানগুলো থেকে অবৈধভাবে কোটি কোটি হাতিয়ে নিচ্ছেন। উচ্চ-আদালতের এক আদেশের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এসব দোকান উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলেও এখনো যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগে জানা গেছে, গুলিস্তান এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১১টি মাকের্টে অবৈধ দোকানগুলোর মধ্যে গুলিস্তানের পুরাতন বাজার হকার্স মার্কেট (পোড়া মার্কেট) অন্যতম। এই মার্কেটের নিচতলায় যেখানে কার পার্কিং রাখার কথা, সেখানে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে ৩২৭টি দোকান। নকশা পরিবর্তন করে কর্পোরেশনের অসাধু কর্মকর্তারা এ মার্কেটটিতে স্থায়ীভাবে দোকান বরাদ্দ দিয়েছেন।

এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তা আবার বাতিলও করা হয়। আবার উচ্ছেদেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর উচ্ছেদের জন্য গত ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ের জন্য ১০ প্লাটুন পুলিশ মোতায়েনেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন অবৈধ স্থাপনা ও দোকানগুলো উচ্ছেদ না হওয়ায় দোকানগুলো বৈধতা নিয়ে দেয়ার নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র।

এ বিষয়টি নিয়ে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। আর দোকানগুলো বরাদ্দের নাম করে অর্থ আদায়কারী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে গত ২০০১৪ সালের ১৮ জুন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করা হয়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে গুলিস্তান পুরান বাজার হকার্স সমিতির নেতা মো. মনোয়ার হোসেন ওরফে মুন তার সহযোগীরা ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দক্ষিণের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে দোকান বরাদ্দ দিয়ে উপার্জন ও মানি লন্ডারিং ও জ্ঞাত আয় বহির্ভুত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পায়।

এ ঘটনায় মো. আবুল কালাম নামে এক ব্যবসায়ীকে গত ২০১৪ ও ২০১৬ সালে দুদক কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য পৃথক নোটিস করা হয়। এরপর চলতি বছরের গত ৭ এপ্রিল দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধানকারী-যাচাইকারী কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম সাক্ষী নেয়ার জন্য মো. আবুল কালামকে পুনারায় চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, মো. আব্দুল হান্নান ওরফে নান্নু সভাপতি ও মো. মনোয়ার হোসেন মনু, সাধারণ সম্পাদক, গুলিস্তান হকার্স মার্কেট। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দোকান বরাদ্দসহ বিভিন্ন প্রকার দুর্নীতি, অবৈধ উপার্জন, মানি লন্ডারিং ও জ্ঞাত আয় বহির্ভুত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। গত ২০১৪ সালের ১৮ জুন অভিযোগের ভিত্তিতে চলতি বছরের গত ১০ এপ্রিল আবুল কালাম আজাদকে সাক্ষীর জন্য পুনরায় নোটিস করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা গুলিস্তান পুরান হকার্স মার্কেটের বেজমেন্টকে গাড়ি পাকিংয়ের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। ভবনটি দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ হওয়ার পর অবৈধভাবে নিচতলার কার পার্কিংয়ের স্থান ৩৫০টি দোকান বরাদ্দ দেয় সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগ থেকে। এরপর প্রতিটি দোকান থেকে ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এরপর ১৫ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটির নির্বাচনে সাঈদ খোকন নির্বাচিত হওয়ার পর পুনরায় দোকানগুলো স্থায়ীভাবে বরাদ্দের নামে পাঁচ লাখ টাকা করে কয়েক কোটি টাকা আদায় করার অভিযোগ উঠে। এভাবে দোকানগুলো লাখ লাখ টাকা ক্রয় আর বিক্রয় করার অভিযোগ উঠেছে।

আর শাহবাগ এলাকার প্রভাবশালী এক নেতা ক্ষমতার দাপটে বিভিন্ন মার্কেট কমিটিতে প্রবেশ করেন। আর মার্কেটগুলোর মধ্যে গুলিস্তান রেলওয়ে মার্কেট, পীর ইয়ামেনি মার্কেট, খদ্দর বাজার হকার্স মার্কেটের পদ দখলে নেন তিনি। এরপর বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ওই নেতা জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে।

আরেক সূত্র জানায়, অবৈধ দোকানগুলো সমপ্রতি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হলে তা বৈধ করে দেয়ার কথা বলে মার্কেটের নেতা মনোয়ার হোসেন মনুর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধচক্র এসব টাকা উত্তোলন করেন। ওই মার্কেটেই মনোয়ার হোসেন মনুর কার্যালয় রয়েছে। কার্যালয়ে বসেই তিনি এসব করছেন বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রেও জানা গেছে।

মার্কেটের এক সুত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন থেকে ওই দোকানগুলো স্থায়ীভাবে বরাদ্দের জন্য দোকান প্রতি আড়াই লাখ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি দোকান থেকে টাকা তোলা হয়ে গেছে। বাকিদের থেকেও আদায় করার অভিযোগ উঠেছে। সব মিলিয়ে এই মার্কেট থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। পরে তা আবার সিটি কর্পোরেশন বাতিল করেছে। এখন পুনরায় স্থায়ী করার নামে টাকা দিতে হচ্ছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কেটের একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে মনোয়ার হোসেন মনুর সেল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর পুনরায় তিনি প্রতিবেদকের সেলফোনে ফোন করে বলেন, আমাদের মার্কেটের উপরে নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে দোকাণ নির্মাণ শেষ হলে এগুলো ছেড়ে উপরে চলে যাবেন বলে জানান তিনি।

খবর নিয়ে জানা গেছে, পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দের সঙ্গে ডিএসসিসির কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। আর এদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতি, সরকার দলীয় স্থানীয় নেতাকর্মীরাও রয়েছেন। একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পার্কিংয়ের স্থানে নির্মিত প্রতিটি দোকানের জন্য নেতারা মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আবার মামলার দোহাই দিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের আরও টাকা নেয়া হচ্ছে। গুলিস্তান এলাকা তথা মার্কেটের প্রভাবশালী নেতা মনোয়ার হোসেন মনু একসময় হাতে করে বোরখার হকারি করতেন। গুলিস্তান থেকে মালামাল কেনার কারণে খ্যাতি অর্জন করেন। আর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার (পোড়া) মার্কেটে। নানান কৌশলসহ অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দুর্নীতির অভিযোগ, যা বর্তমানে দুদকে তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-সহকারী পরিচালক মো. নুরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা উপ-সহকারী পরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি বিষয়টি জানাতে পারেননি। এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, কিন্তু একটি মামলার কারণে পরে তা উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি।’