শিরোনাম

সমালোচনা পিছু ছাড়েনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের

ফারুক আলম   |  ০২:৩০, অক্টোবর ১৩, ২০১৯

দেশে যতগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে সবগুলোর তুলনায় বেশি সমালোচিত গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এর আওতাধীন পূর্ত অধিদপ্তর ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডে বরাবর সমালোচনার মুখে পড়ছে। কোনোভাবেই সমালোচনা পিছু ছাড়ছে না মন্ত্রণালয়ের সংস্থাগুলোর।

সম্প্রতি বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা থেকে শুরু করে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বালিশকাণ্ড দুর্নীতি ও জি কে শামীমের টেন্ডার বাণিজ্যের আলোচিত ঘটনাগুলোর সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এসব সমালোচনার দায়ভার নিয়েই বছর পাড় করছে মন্ত্রণালয়টি।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম। কোনো অনিয়মের সঙ্গে আপোষ করেন না তিনি। ফলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অনিয়ম-দুর্নীতির বর্হিপ্রকাশ ঘটছে। এর আগে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। সেই সময়ে অনিয়ম-দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছেন।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের দুর্নীতির কারণে সমালোচনার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য একটি পরিপত্র জারি করেছে। যেখানে তৃতীয় পক্ষ দিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষাসহ ১৪টি দিকনির্দেশনা উল্লেখ করা হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- বিশেষ কারণ ছাড়া কোনো প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাবে না। প্রকল্পের ড্রয়িং ও ডিজাইন চূড়ান্ত করে প্রকল্প অনুমোদনের জন্য মোট ব্যয় প্রাক্কলন করতে হবে। প্রকল্প এলাকায় দৃশ্যমান স্থানে বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত সাইন বোর্ড স্থাপন করতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকে প্রকল্প এলাকায় সার্বক্ষণিক থাকতে হবে।

জানা গেছে, রাজউক ও গণপূর্তের কিছু অসাধু কর্মকর্তারা নিজেদের আখের গোছাতে দুর্নীতির আশ্রয় নিলেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এতে বিগত বছরগুলোতে যারাই রাজউক চেয়ারম্যান ও গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অনিয়মের ঘটনাগুলো ঘটেছে। ফলে অতীতের সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির গ্লানি বর্তমানে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে মন্ত্রণালয়টির।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পুরো ঢাকায় নতুন করে যতগুলো বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ চলছে সবগুলো নিয়ম-মাফিক হচ্ছে সেটি কখনই বলা যাবে না। কারণ এখানে কিছু ভবন মালিক ও ডেভেলপার এতোটাই শক্তিশালী যারা রাজউকের মতো সংস্থার নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। আবার যেসব ভবন মালিক রাজউকের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাতে পারেন না তারা কৌশলেই কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে নিয়মবর্হিতভাবেই ভবন নির্মাণ করছেন।

একই অবস্থা গৃহায়ন ও গণপূর্তের। এখানে কিছু অসাধু কর্মকর্তা অতীতেও ছিলেন বর্তমানেও আছেন যারা ম্যানেজ-ই চলেন। এ দুটি সংস্থার কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি ও অনিয়ম রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে মন্ত্রণালয়কে।

জানা যায়, বনানীর এফআর টাওয়ারের নকশা জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধভাবে ১৬ থেকে ২৩ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় রাজউকের সহকারী পরিচালক শাহ মো. সদরুল আলমকে গ্রেপ্তার করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আর পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্র গ্রিন সিটি প্রকল্পে নজিরবিহীন বালিশ দুর্নীতির ঘটনায় প্রকল্প পরিচালকসহ ৩৪ কর্মকর্তাকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

প্রকল্পের নির্মাণাধীন ২০ তলা ও ১৬ তলা ভবনের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় এবং ভবনে উঠানোর কাজে অস্বাভাবিক ব্যয়সংক্রান্ত দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত করাসহ দুর্নীতির ৩৬ কোটি ৪০ লাখ ৯ হাজার টাকা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়।

অভিযুক্তদের মধ্যে ১৬ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ প্রকল্পে একটি বালিশের পেছনে ব্যয় দেখানো হয় ছয় হাজার ৭১৭ টাকা। এর দাম বাবদ ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা আর সেই বালিশ নিচ থেকে ফ্ল্যাটে উঠাতে খরচ ৭৬০ টাকা উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ‘টেন্ডারসম্রাট’ খ্যাত যুবলীগ নেতা জি কে শামীম। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের পাওয়া ৩ হাজার কোটি টাকার ১৭টি প্রকল্পের কাজ করছেন। এই টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গে গণপূর্তের যেসব কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতোমধ্যে গণপূর্তের এক অতিরিক্ত প্রকৌশলীকে ওএসডি করা হয়েছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে আমার সংবাদকে বলেন, সম্প্রতি এই মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনিয়গুলো প্রকাশ পাচ্ছে। এতে যারা আগে দুর্নীতি করেছেন তাদের অনেকেই ঘাপটি মেরে আছেন।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে এমন অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে কর্মকর্তারা দুর্নীতি-অনিয়ম করার সাহস পাবেন না। কিন্তু কিছুদিন পর শীতিলতা দেখা দিলেই ঘাপটি মারা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রধান নির্বাহী ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, দেশে একচেটিয়াভাবে দুর্নীতির প্রতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এটি বিকশিত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ- যারা দুর্নীতি করেন তাদের বিচারের আওতায় আনা হয় না।

মুদ্দা কথা হল- যাদের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তাদের একাংশের মধ্যে দুর্নীতির প্রতি সহায়নশীলতা আছে। দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব শুধুমাত্র দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নয়, এটি সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে। সরকার দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে যারা বাস্তবায়ন করবেন তাদের একাংশই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।

তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়িকদের যোগসাজশের কারণে টেন্ডার বাণিজ্যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের দুর্নীতির বোঝা দেশের সাধারণ জনগণকে পোহাতে হয়।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, রাজনৈতিক কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হয় কিন্তু দুর্নীতির কারণে খুববেশি হয় না। এখন আরেকটি অন্তরায় তৈরি হয়েছে- ফৌজদারি অপরাধ করলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেপ্তার করা জন্য সরকার কিংবা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমতি লাগবে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউকের এমন অনিয়মের বিষয়ে মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের সঙ্গে সচিবালয়ে দেখা করতে গেলে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনুষ্ঠানে আছেন বলে জানান।

এফএ/আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত