শিরোনাম

জনস্বার্থে মামলায় সমাধান খুঁজছেন ভুক্তভোগীরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥শরিফ রুবেল   |  ০৬:৩৮, অক্টোবর ১৩, ২০১৯

বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনিয়ম ও অসঙ্গতির ঘটনা আদালতের নজরে এনে জনস্বার্থে রিট করেন আইনজীবীরা। মাঝে মধ্যে ভুক্তভোগীরাও আইনজীবীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়ে এসব মামলা করে থাকেন। উচ্চ আদালতে সম্প্রতি জনস্বার্থে মামলা বেড়েই চলেছে।

মূলত দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি ও গণমাধ্যমে এসব মামলা নজরে এনে সংবাদ প্রচারে দেশবাসীর সহানুভূতির অর্জনের জন্যই সাধারণ জনগণ জনস্বার্থে মামলার দিকে বেশি ঝুঁকছে। আর গণমাধ্যমে উক্ত রিটের ব্যাপারে সংবাদ প্রচার হলে সেটা ধামাচাপা দেয়ার সুযোগও কম থাকে বলেই ভুক্তভোগীরা এ পথ বেছে নেন।

পরে আদালতও এসব মামলাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আদেশ দিয়ে থাকেন। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না বলেই জনগণ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই তারা জনস্বার্থে মামলার দিকে বেশি ঝুঁকছে। ফলে এসব মামলা করে উচ্চ আদাালতের রায়ের পর জনগণ তাদের অধিকার ফিরে পাচ্ছে। আইনি সংস্থাগুলো বা প্রতিষ্ঠান যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতো তাহলে সাধারণ জনগণের মামলা নিয়ে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো না।

কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এজন্যই তারা জনস্বার্থের মামলাকেই বিকল্প পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এসব মামলায় উচ্চ আদালতের রায়ের পর জনগণ তাদের অধিকার ফিরে পাচ্ছে। কাজেই এখন জনস্বার্থে দায়ের করা মামলাগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সমপ্রতি দেশের উচ্চ আদালত জনস্বার্থে বেশকিছু আলোচিত আদেশ দিয়েছেন।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বা নিহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, ডেঙ্গু ও এডিস মশা নির্মূল, নিম্নমানের ক্ষতিকারক পণ্যের লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ, গণপিটুনির ঘটনায় আদেশ, গাড়ি রিক্যুইজিশন নিয়ে আদেশ, পাস্তুরিত দুধে এন্টিবায়োটিক পাওয়া নিয়ে আদেশ, ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ে আদেশ, নদ-নদী রক্ষায় আদেশ, সিজারে প্রসূতির মৃত্যু আদেশগুলো এর মধ্যে অন্যতম।

এদিকে চলতি বছর বহুল আলোচিত জনস্বার্থে মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে— খাদ্যে ভেজাল, দুধে ভেজাল, মশানিধনে সিটি কর্পোরেশনের ব্যর্থতা, পানিতে দূষণ, পরিবেশ দূষণ, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, নদীদখল ও দূষণ রোধ, খাদ্যপণ্যে ফরমালিন ঠেকানো এবং সড়ক দুর্ঘটনাসহ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিসংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যাপারে জনস্বার্থে মামলা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এ ধরনের মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

উচ্চ আদালতও এসব মামলা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে প্রতিকার দিতে এগিয়ে আসছেন। দুর্ঘটনায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণ, খাদ্যে ভেজাল রোধ করা, দুদককে সচল করা, নদী দখলদারদের উৎখাত করা, অনাগ্রহী পুলিশকে তদন্ত করতে বাধ্য করা, সবশেষ আলোচিত হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণখেলাপিবান্ধব পরিপত্রের কার্যকারিতা স্থগিত করা।

তবে মাঝেমধ্যে অযৌক্তিকভাবে পাবলিক ইন্টারেস্টের (পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন বা জনস্বার্থের মামলা) মামলা অনেক অ্যাডভোকেট নিজেদের স্বার্থে নিজেদের মিডিয়ায় প্রচারের জন্য করে থাকেন। কিন্তু রুলের পর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না বলেই সম্প্রতি উচ্চ আদালতও বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রিট আবেদনের সংখ্যা ছিল ৮৩ হাজার ৯০৬টি। এর মধ্যে শুধু গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে তিন ৭৬৫টি এবং নিষ্পত্তি হয়েছে দুই হাজার ৫২৪টি। এদিকে ১ এপ্রিলের আগে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রিট আবেদনের সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৬৬৫টি। অর্থাৎ এ অল্প সময়ের মধ্যে এক হাজার ২৪১টি রিট আবেদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

অপরদিকে সুপ্রিম কোর্টের তথ্য আরও বলছে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন রিট আবেদনের সংখ্যা ছিল ৮১ হাজার ৪৪৪টি। আর ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে রিট আবেদন দায়ের হয় ১৭ হাজার ২১৪টি। আর এ সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১২ হাজার ৫৬০টি।

আর ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারির আগে বিচারাধীন রিট আবেদনের সংখ্যা ছিল ৭৬ হাজার ৭৭০টি। দেশের কোনো নাগরিক জনস্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিষয়ে বা সরকারি-বেসরকারি কোনো সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে সংবিধানের ১০২ ধারা অনুসারে তিনি রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। রিটে খরচ কিছুটা বেশি হলেও সাধারণত দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে, ৬০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম জনস্বার্থমূলক মামলা ধারণার প্রচলন শুরু হয়। ঊনবিংশ শতাব্দী অর্থাৎ ১৮৬০ সালের দিকে ‘আইনগত সহায়তা পাওয়ার’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ৯০-এর দশকে ভারত উপমহাদেশেও এ ধরনের মামলার সূত্রপাত ঘটে।

পরবর্তীতে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও এটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কাছে পিআইএলের সংখ্যার আলাদা কোনো হিসাব নেই। তবে পর্যায়ক্রমে দিন যত গড়িয়েছে, ততই এ ধরনের মামলা বেড়েছে। জনস্বার্থ রক্ষায় হিউম্যান রাইটস পিস ফর বাংলাদেশ, বল্টাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ (বেলা) মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোই এ মামলাগুলো বেশি করেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ মামলাতেই আদালত রুল জারি করেছে।

১৯৯৬ সালে ‘মহিউদ্দিন ফারুক বনাম রাষ্ট্র’ এ মামলা ফ্যাপ-২০ (পরিবেশবিষয়ক) মামলা নামেও পরিচিত। এ মামলায় একটি বিতর্কিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের ফলে একটি বিশেষ এলাকার পরিবেশে সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। এ মামলার রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে জনস্বার্থমূলক মামলা করার আনুষ্ঠানিক দ্বার খুলে যায়।

কারণ যারা এ ধরনের মামলা করতো, তারা ছিলো বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত এনজিও। বিদেশি ফান্ডের ওপর ভিত্তি করে জনস্বার্থের মামলাগুলো করতো। কিন্তু ২০০৬-০৭ সাল থেকে এই বিদেশি ফান্ডের বাইরে থেকে যখন নিজ উদ্যোগে কাজ শুরু করলাম, তখন এর ব্যাপ্তি লাভ করেছে। এখন ব্যক্তিগতভাবে অনেক আইনজীবী এগিয়ে এসেছেন। ফলে এ ধরনের মামলার সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে।

সম্প্রতি জনস্বার্থের মামলাগুলোর জনপ্রিয়তার কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে হাইকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সিহাব উদ্দিন খান বলেন, দেশে আইনি প্রদক্ষেপ গ্রহণকারী যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো আছে তারা মূলত বিচারপ্রত্যাশীদের যথোপযুক্তভাবে সন্তুষ্ট করতে পারেন না বা তাদের গাফিলতির কারণেই মানুষ জনস্বার্থে মামলা করতে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়। আর উচ্চ আদালতও তাদের মালালাগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততর সময়ের মধ্যে সেটার সমাধান দিতে এগিয়ে আসে বলেই মানুষ এখন এখানে ছুটে আসে।

কিছু কিছু জনস্বার্থের মামলা আদালতের আদেশের পরও কার্যকর না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই মামলাগুলো কার্যকর হয় না। তিনি বলেন, অতি সম্প্রতি কিছু আইনজীবী আছেন যারা পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সত্যতা যাচাই না করেই মামলা ঠুকে দেন, এতে আদালতও বিব্রত হয়। এসব কাজ থেকে আইনজীবীদের অত্যন্ত সতর্ক ও বিরত থাকা উচিত।

এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং পরিবেশ ও মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন এইচআরপিবির চেয়ারম্যান মনজিল মোরসেদ আমার সংবাদকে বলেন, ২৯০টি জনস্বার্থ মামলা করেছেন এই আইনজীবী। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯০টি, বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মূলত প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই জনস্বার্থে রিট মামলার প্রয়োজন পড়ে। আইন বাস্তবায়নে নিষ্ক্রিয়তা থাকলে বা প্রশাসনের পদক্ষেপ গ্রহণে নিষ্ক্রিয়তা দেখা দিলে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রয়োজনে এ ধরনের মামলা করতে হয়। তবে মামলা দায়ের ও উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ বাড়লেও এখনো এসব মামলায় দেয়া আদেশ পালনের ক্ষেত্রে শৈথিল্য রয়েছে বলে মনে করেন এ আইনজীবী।

তিনি বলেন, ‘আদেশ বাস্তবায়নের জন্য লেগে থাকতে হয়। তাহলে একদিন না একদিন আদেশ বাস্তবায়ন হবেই।’

জনস্বার্থে মামলা বৃদ্ধির ব্যাপারে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন মানিক বলেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি গত দশ বছরে অনেক উন্নত হয়েছে। দেশের জনগণও আগের তুলনায় অনেক সচেতন হয়েছে, এজন্যই এসব মামলার সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এটাও একটা সফলতা।

তিনি আরও বলেন, মিথ্যা বানোয়াট কোনো মামলা করা যাবে না যাতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এদিকে খেয়াল রেখেই আইনজীবীদের জনস্বার্থের মামলাগুলো করতে হবে। আর মামলা করার ক্ষেত্রে দেখতে হবে প্রকৃতপক্ষে কোনো জনস্বার্থ জড়িত আছে কিনা তাহলেই এই মামলা গুরুত্ব পাবে।

জনস্বার্থের মামলাগুলো কার্যকরের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ ব্যাপারে বলেন, আমার জানা মতে সব আদেশই পালিত হচ্ছে। তবে আদেশ প্রতিপালিত হচ্ছে কিনা সেটি দেখতে একটি মনিটরিং সেল করা যেতে পারে।

আর আদালত আদেশ দেয়ার পর সেটা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেয়া হয়। কিন্তু পরে সেটা পালন করা না হলে সাংবাদিকরা যেভাবে জানতে পারে আমাদের সেভাবে জানার সুযোগ থাকে না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত