শিরোনাম

বুয়েটের ভর্তিপরীক্ষায় স্বপ্ন আর ভয়ের মিশেল

প্রিন্ট সংস্করণ॥নুর মোহাম্মদ মিঠু   |  ০৭:০৮, অক্টোবর ১৪, ২০১৯

স্বপ্ন আর ভয়! এ দুইয়ের মিশেলে সমপন্ন হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষা। বুয়েট প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে লক্ষ্য করা গেছে সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও ভয়ের ছাপ।

সন্তানকে প্রকৌশলী বানানোর স্বপ্নে বিভোর একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, বুয়েট থেকে প্রকৌশলী হওয়ার প্রথম ধাপই ভর্তিপরীক্ষা। সেখানে সন্তানকে এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করাবেন কী না এ নিয়েই ভাবতে হয়েছে অসংখ্যবার।

শুধু তাই নয়, পরিবারসহ স্বজনদের সঙ্গে পরামর্শ করেও সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যেই সন্তানকে নিয়ে বুয়েটের ভর্তিপরীক্ষায় অংশগ্রহণ করাতে এসেছেন বলে আমার সংবাদের সঙ্গে আলাপ করা একাধিক অভিভাবক জানান। ভয়ের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে অভিভাবকদের অনেকেই উল্লেখ করেছেন সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিশ্বব্যাপী আলোচিত আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।

তারা এও বলছেন, বুয়েটের মতো এমন একটি প্রতিষ্ঠানে অপরাজনীতির কারণেই আবরারকে হত্যার শিকার হতে হয়েছে। এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেকেই স্বপ্ন দেখেন বুয়েটে ভর্তি হয়ে নিজেকে প্রকৌশলী হিসেবে তৈরি করবেন।

কিন্তু তাদের এ স্বপ্নে বারবার কড়া নাড়ছে আবরার হত্যাকাণ্ড, ভর্তিপরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা একাধিক শিক্ষার্থীও আমার সংবাদকে বলেছেন এমনটাই। যদিও বুয়েটের ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেছেন, ভর্তিপরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং আবরার হত্যার প্রতিবাদের আন্দোলন ভর্তি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলেনি। শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণেও কাজ করছেন তারা।

এদিকে গতকাল দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বুয়েটে ভর্তিপরীক্ষা দিতে এসেছে ১২ হাজার পরীক্ষার্থী। সকাল ৭টা থেকেই বুয়েট প্রাঙ্গণে ক্রমশই বাড়তে থাকে পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা। পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণজুড়ে ছিল সন্তানকে প্রকৌশলী বানানোর গভীর স্বপ্নে বিভোর থাকা অভিভাবকদের ভিড়। এদের মধ্যে কারো ছেলে, কারো মেয়ে, কারো ভাই কিংবা বোন এসেছে পরীক্ষা দিতে। কিন্তু পরীক্ষার উত্তেজনার চাইতেও যেন চাপা ভয় কাজ করছে তাদের সবার মধ্যেই। সবার ভয়ের কারণ একটাই- আবরার হত্যা!

গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় ভর্তিপরীক্ষার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরই একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় আমার সংবাদের। তাদের মধ্যে একজন গল্পের মতো করে বলেন, আমার স্বামীও বুয়েটের প্রাক্তন ছাত্র। যে কারণে আমার প্রথম সন্তানকেও বুয়েটেই পড়াবেন বলে স্বপ্ন দেখা শুরু করেন তিনি। সেই স্বপ্ন আমিও দেখা শুরু করি। বুকে লালন করা দীর্ঘদিনের ওই স্বপ্ন নিয়েই এ দম্পতি তাদের ছেলেকে ওইভাবে গড়েও তুলেছেন।

প্রাথমিকভাবে যেহেতু এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে ভর্তিপরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেছে, সেহেতু বুয়েটে ভর্তির ইচ্ছেটাও আরও কয়েকগুণ বেশিই বেড়ে যায়। বাবার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য ছেলেও দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করেছে এবং তার মধ্যেও বাবার মতো প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন তৈরি হয়।

কিন্তু এরই মধ্যে এ বুয়েটেই ঘটে গেছে বিশ্বব্যাপী আলোচিত আবরার হত্যকাণ্ড। এরপরই বেরিয়ে এসেছে অপরাজনীতির নোংরা রূপসহ অপরাধ সৃষ্টির অসংখ্য অজানা রহস্য। যেখানে এমন হত্যাকাণ্ড এবং ছাত্র রাজনীতির এমন বেহাল দশা সেখানে কেন জানি আবরারের জায়গায় বারবার নিজের ছেলের ছবি ভেসে উঠছে -জানান ওই অভিভাবক। আর এ অবস্থায় চরম উৎকণ্ঠাও বিরাজ করছে মনের মধ্যে।

এমতাবস্থায় পরীক্ষার আগের রাত থেকেই ভাবাভাবি শুরু হয় ছেলেকে পরীক্ষা দেয়াতে নিয়ে আসবেন কী না? এ নিয়ে পরামর্শও করা হয় নিজেদের আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গেই। পরীক্ষার্থীর বাবা বুয়েটের প্রাক্তন ছাত্র তিনিও বলেন, এই বুয়েট আর সেই বুয়েটের মধ্যে অনেক তফাৎ সৃষ্টি হয়েছে ইতোমধ্যেই। ছেলের আগ্রহ এবং তার স্বপ্ন পূরণের আগ্রহ দেখেই অনেক ভাবার পর ছেলেকে নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে আসলাম বলে জানান ওই দম্পতি। কথা বলার সময়ে তাদের ছেলে পরীক্ষার হলেই ছিল। পরীক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু এ দম্পতির বাইরে বসে একটাই চিন্তা, ভেতরে কোনো গণ্ডগোল হলো না তো!

অভিভাবকদের মধ্যে ভয় ও চিন্তার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন আমার সংবাদকে বলেন, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শুধু অভিভাবকই নয়, গোটা দেশের মানুষের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এমন নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড আগে কখনো ঘটেনি বুয়েটে। সনি হত্যাকাণ্ডও এতটা ভয়ঙ্কর ছিল না। যে কারণে অভিভাবকরা সন্তান নিয়ে চিন্তা করছেন।

তবে আবরার হত্যাকাণ্ডের পর এটাও দেখা যাচ্ছে- তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে যদি সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হয়, বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা হয় এবং হলগুলোতে থাকা টর্চার সেলগুলো বন্ধ করা যায় তাহলে এসব ঘটনার পুনরাবুত্তি ঘটবে না। আমরা দেখেছি বুয়েটের সর্বশেষ ঘটনার পর সেসবের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজও করছে বিচারবিভাগ, সরকার, প্রশাসন মোটকথা সবাই। ঘটনা যতই নৃশংসতম হোক সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস বাস্তবায়নই একমাত্র অভিভাবকদের মন থেকে দুশ্চিন্তা এবং ভয় দূর করতে পারে।

এছাড়া তিনি বলেন, ছাত্রলীগ যতই শক্তিশালী হোক, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সবাই সংঘবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তারা আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটানোর সুযোগ পাবে না। বুয়েটের ঘটনায় বুয়েট কর্তৃপক্ষসহ সর্বমহলের এমনই উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে। যে কারণে অভিভাকদের শঙ্কিত হওয়ার কারণ দেখছি না। শঙ্কিত হওয়ার যে কয়টি কারণ দেখা যাচ্ছে, শঙ্কিত না হওয়ার জন্যও ঠিক তার চেয়েও অধিক কারণ রয়েছে।

সবশেষ তিনি বলেন, বুয়েটের ঘটনায় কর্তৃপক্ষ চুপ থাকলে শঙ্কা থাকতো। যেহেতু সবাই সোচ্চার, কর্তৃপক্ষও দুঃখ প্রকাশসহ যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং তারা এলার্ট থাকবে বলেও বলছে, তাহলে শঙ্কিত হওয়ার কারণ দেখছি না।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত