শিরোনাম

বিএনপির সঙ্গে প্রকাশ্যে আসছে জামায়াত!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম   |  ০৬:৩৩, অক্টোবর ১৬, ২০১৯

জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির পর দলটির শীর্ষ নেতারা দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকলেও সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ফের প্রকাশ্যে আসছে। জাতীয় নির্বাচনের পর জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হলেও সেটি নিরসন করা হয়েছে বলে দাবি দলটির মিডিয়া উইংয়ের।

ক্ষমতাসীন দলের দুঃসময়, দেশবিরোধী চুক্তি, আবরার হত্যা, খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যু নিয়ে জামায়াতকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবছে বিএনপি। ২০ দলীয় জোট, ঐক্যফ্রন্ট, বাম মোর্চা নিয়ে নতুন ভাবনার সঙ্গে জামায়াতকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

খালেদা জিয়ার এক উপদেষ্টার ভাষ্য, কারাগার থেকে খালেদা জিয়ার নির্দেশনার কারণেই জামায়াতকে পাশে রাখছে বিএনপি। সামপ্রতিক ক্ষমতাসীন দলের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার প্রতিবাদে বিএনপির সরব প্রতিবাদের সঙ্গে জামায়াতকে একমঞ্চে দেখা যাচ্ছে। কখনো ২০ দলীয় জোটের প্রোগ্রামে, কখনো দলীয় প্রোগ্রামে। আবার বিএনপির সঙ্গে তালমিলিয়ে আলাদা কর্মসূচিতে।

গতকালও জাতীয় প্রেস ক্লাবে বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার প্রতিবাদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সঙ্গে এক টেবিলে দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক ও কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিমকে।

সামপ্রতিক ইস্যু নিয়ে এ দুই নেতার ভাষ্য, আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন বেগম খালেদা জিয়াকে। অথচ খালেদা জিয়া এখন জেলে। আন্দোলন ছাড়া খালেদা জিয়া মুক্ত হবে না। বুয়েট ছাত্র আবরারের রক্তকে সামনে রেখে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে লাল-সবুজের পতাকাকে আবার নতুন করে তুলতে হবে।

এই দুই নেতার আরও ভাষ্য, যদিও এখনো ৪৭-এর সীমানা ঠিক আছে, পতাকাও ঠিক আছে। কিন্তু এগুলো ঠিক রেখেই ভারত পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ভারতীয় আধিপত্যে পুরো দেশ আজ আতঙ্কে। যদি আবরারকে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় তাহলে সবাইকে ঘর থেকে বের হয়ে প্রতিবাদ জানাতে হবে।

এর আগে জাতীয় মুক্তিমঞ্চের আহ্বায়ক ও এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের সঙ্গেও দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ারকে। গত ২৭ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জাতীয় মুক্তিমঞ্চ’র ব্যানারে নতুন জোটের আত্মপ্রকাশকালে অলি আহমদ বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালের জামায়াত আর ২০১৯ সালের জামায়াত এক নয়। দেশকে তারা অনেক ভালোবাসে, তাদের মধ্যে অনেক সংশোধনী এসেছে।’

সামপ্রতিক ইস্যুতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, হঠাৎ করে দেখা গেছে বিএনপির কর্মসূচিগুলোর সঙ্গে জামায়াতের প্রতিবাদের মিল পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা ও বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি প্রসঙ্গ নিয়ে। আবরার ইস্যু নিয়ে বিএনপি পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে পল্টনে মহাসমাবেশ করেছে, সারা দেশে বিক্ষোভ করেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন প্রতিবাদ মিছিল করছে ছাত্রদল, দলীয় অঙ্গ সংগঠনগুলোও প্রেস ক্লাব, ডিআরইউ, হাইকোর্ট চত্বরে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও শোক র‌্যালি বের করেছে যদিও তা পুলিশি বাধায় পণ্ড হয়ে যায়। তবে বসে নেই জামায়াতও। আবরার প্রসঙ্গ নিয়ে তারা রাজধানীসহ সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। প্রতিদিন কয়েকবার প্রতিবাদ পাঠিয়েছে গণমাধ্যমে।

সামপ্রতিক ইস্যু নিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক বহিষ্কৃত হওয়ার পরও অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাই প্রমাণ করে যে, তাদের বহিষ্কার সত্ত্বেও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী চরিত্র একটুও বদলায়নি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত কোমলমতি স্কুল ছাত্র-ছাত্রী এবং কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরাও ছাত্রলীগের হামলা থেকে রেহাই পায়নি। ছাত্রলীগ অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। প্রশাসনের বিরুদ্ধেও কথা বলতে দেখা গেছে দলটিকে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ১৪ অক্টোবর ডিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আবরার হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত চারজন ছাত্রের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘তারা শিবির সন্দেহে আবরারকে ডেকে নিয়ে মারপিট করেছিল। একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়। হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে মারপিট করা হয়েছে না-কি মারপিটের জন্য মারপিট করা হয়েছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’ আমি তার এ রহস্যজনক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

এছাড়া কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কুষ্টিয়া জেলার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত ‘আবরার ফাহাদের পরিবার জামায়াত-শিবির’ মর্মে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। যেখানে বাবা-মা প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে শোকে প্রায় পাগল, যেখানে সারা দেশের মানুষ শোকাহত, সেখানে তিনি এ ধরনের হাস্যকর বক্তব্য দিয়ে মূলত ফাহাদের বাবা-মার বুকভরা আর্তনাদকেই উপহাস করেছেন এবং ফাহাদের বিদেহী আত্মার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেছেন। এ যেন ‘মরার উপর খারার ঘা’।

গতকাল জাতীয় প্রসক্লাবে বিএনপির সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার বলেন, আবরার আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে শহীদ হয়েছে। তার এই রক্তদানকে যদি আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় তাহলে সবাইকে ঘর থেকে বের হয়ে প্রতিবাদ জানাতে হবে। আধিপত্যবাদের আধুনিক চরিত্র বদলে গেছে, এখন তারা ভূখণ্ড দখল করতেছে। আর এটিকে নামকাওয়াস্তে ঠিক রাখলেও পানি, গ্যাস, ব্যবসা, শিল্প-সাহিত্য, কল-কারখানা সব কিছু তারা কন্ট্রোল করছে। আমাদের খুশি হওয়ার কিছু নেই আমাদের ৪৭ এর সীমানা তো ঠিক আছে, পতাকা তো ঠিক আছে। তারা এগুলো ঠিক রেখে পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ভারতীয় আধিপত্যে পুরো দেশ আজ আতঙ্কে। আবরারের রক্তকে সামনে রেখে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ারও কথা জানান তিনি।

গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশবিরোধী চুক্তি করা হয়েছে। আজব ব্যাপার নয় কি, এখন বলতেছে মানবিক কারণে পানি দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আবরারকে পশুর মতো মারা হয়েছে। তার দম বেরিয়ে যাচ্ছে, পানি চাওয়া হয়েছে তবুও পানি দেয়া হয়নি। লাঠিয়াল বাহিনী থেকে দেশ মুক্ত করতে হলে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে বলেও জানান তিনি। জাতিসত্তার আন্দোলনে এখনো সবাই এক না হতে পারলে আবরারের রক্ত বৃথা যাবে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে লাল-সবুজের পতাকাকে আবার নতুন করে তুলতে হবে।

জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, খালেদা জিয়া ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই কারাগারে আটক রয়েছেন। আবরার ফাহাদের হত্যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এই সরকার বিষাক্ত সাপের মতো। আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন বেগম খালেদা জিয়াকে। অথচ খালেদা জিয়া আজ কারাবন্দি।

বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের তৎপরতা নিয়ে জানতে চাইলে বেগম খালেদা জিয়ার এক উপদেষ্টা আমার সংবাদকে বলেন, আগে থেকেই বিএনপিতে ২০ দল থাকলেও জোটে জামায়াতের গুরুত্বই বেশি। এখনো রয়েছে। সামপ্রতিক ইস্যু নিয়ে প্রতিবাদের জন্য বেগম খালেদা জিয়া বিএনপিকে নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ আন্দোলনে জামায়াতকে পাশে রাখতে বলেছেন। সেই আলোকেই বিএনপির কর্মসূচিগুলোতে জামায়াতকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত