শিরোনাম

ডিএসসিসিতে ঘাটে ঘাটে দুর্নীতি তবুও নির্দোষ প্রমাণিত!

প্রিন্ট সংস্করণ॥ ফারুক আলম   |  ০৬:৩৭, অক্টোবর ১৬, ২০১৯

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ক্রয় ও ভাণ্ডার। এ বিভাগের নিম্নমান সহকারী-কাম মুদ্রাক্ষরিক বিনোদ চন্দ্র সরকার ডিএসসিসির শীর্ষ কর্তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের সুবিধা দিতে এক জনকেই চার পদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এতে অনিয়মের আশ্রয় নেয়ায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগপত্র দেন ভুক্তভোগীরা। বিনোদ চন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিটি কর্পোরেশন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান ডিএসসিসির বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা (উপ-সচিব) এ কে এম লুৎফুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, তদন্ত শেষে প্রতিবেদন ডিএসসিসির সচিবের দপ্তরে জমা দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, বিনোদ চন্দ্রের অনিয়মে তাকে ২০১৫ ও ২০১৭ সালে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আর চলতি বছরের ২০ মে তার বিরুদ্ধে ফের অভিযোগ উঠায় ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সিটি কর্পোরেশনের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয় দুদক। ডিএসসিসির নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে তাকে নির্দোষ প্রমাণ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। তবে প্রতিবেদনটি এখনো দুদকের কাছে জমা দেয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিএসসিসির নিম্নমান সহকারী-কাম মুদ্রাক্ষরিক বিনোদ ২৩ বছর একই বিভাগে কর্মরত থাকায় ভাণ্ডারে চরম দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতা, বিভিন্ন ঠিকাদারের সাথে সাব-কন্ট্রাক্টে ব্যবসা করে বর্তমানে ১৬ গ্রেড থেকে ১৪তম গ্রেডের দুটি পদ, ১৩তম গ্রেডের একটি পদ ও মূল পদসহ চারটি পদ দখল করে বিভিন্ন উপায়ে ঘুষ নেয়ার শীর্ষ রেকর্ড গড়েছেন।

তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে। ভাণ্ডার রক্ষকের নথিপত্র তৈরি করে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য বাজার যাচাই-বাছাই করে নথি উপস্থাপন করার সময় প্রতিটি নথি থেকে সাত শতাংশ কমিশন নিয়ে থাকেন। এরপর নথি অনুমোদনের পরে ইজিপি টেন্ডার আহ্বান করার জন্য তিন শতাংশ নেন। টেন্ডারের কার্যক্রম অর্থাৎ নোটিফিকেশন অ্যাওয়ার্ড দেয়ার সময় প্রতিটি নথি থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেন।

এছাড়া কার্যাদেশ ইস্যু করার সময় প্রতিটি নথি থেকে তিন শতাংশ নেন। একাই চারটি পদের দায়িত্ব পাওয়ায় প্রতিটি পদ থেকে মাসে উৎকোচ নিয়ে থাকেন দুই থেকে তিন লাখ টাকা। গুদাম থেকে বিভিন্ন বিভাগের চাহিদাকৃত ইন্ডেন্টের মালামাল বিতরণের সময় পরিমাণ কেটে দেন এবং মালামাল নেই উল্লেখ করে ইন্ডেন্টের মধ্যে কেটে দেন। মজুদ বই পরীক্ষা করে দেখলে এর সত্যতা মিলবে।

অভিযোগ উঠেছে, ভাণ্ডার-রক্ষক (সাধারণ), ভাণ্ডার-রক্ষক (মোটরপাটর্স) এবং ব্যক্তিগত সহকারীর পদসহ মোট চারটি পদ দখল করে ঠিকাদারদের জিম্মি করে ঘুষ আদায় করেন তিনি। এই ঘুষের টাকা মেয়র, প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তাসহ পদস্থ কর্মকর্তাদের পকেটেও যাচ্ছে। এই ঘুষের টাকা সরবরাহ করছেন ডিএসসিসির মেয়রের আস্থাভাজন দু’জন ঠিকাদার।

তারা হলেন— জসিম উদ্দিন সবুজ ও আমিনুল ইসলাম বিপ্লব। আর দুই ঠিকাদার এককভাবে ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের টেন্ডার জালিয়াতি, ভাণ্ডার বিভাগের মশার ওষুধসহ গাড়ির টায়ার ক্রয়, কোদাল-টুকরি ক্রয়সহ সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর মধ্যেই ক্রয় ভাণ্ডার বিভাগের ভাণ্ডার-রক্ষক (সাধারণ), ভাণ্ডার-রক্ষক (মোটরপাটর্স) এবং ব্যক্তিগত সহকারীর পদসহ মোট চারটি পদ দখল করে দুজন ঠিকাদারের সঙ্গে দফারফা করে বাকি ঠিকাদারদের জিম্মি করার অভিযোগে দুদক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। বিনোদ চন্দ্রের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে চার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক এ অভিযোগ করেন। সেখানে উল্লেখ রয়েছে— বিনোদ চন্দ্র দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা, বিভিন্ন ঠিকাদারের সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্টে ব্যবসা করেন।

এ বিষয়ে ক্রয়ও ভাণ্ডার বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা উপ-সচিব নুরুজ্জামান বলেন, বাস্তবে আমি এখানে অল্প দিন হলো যোগদান করেছি।

তাকে কোন পদে রাখা হয়েছে এমন জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি একান্ত প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়া কেউ বলতে পারবেন না। এক জনকে দিয়ে চারটি কাজ করানো মারাত্মক সমস্যা।

তিনি আরও বলেন, অচিরেই বিনোদকে তিনটি পদ থেকে সরিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হবে। অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বিনোদ চন্দ্র সরকার আমার সংবাদকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো মিথ্যা, বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর। এসব অভিযোগের বিষয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। এছাড়া প্রশাসন আমাকে এখানে কাজ করতে বলেছে, তাই করি। আমাকে কী কারণে চারটি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা সচিব স্যার জানেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সচিব (যুগ্ম সচিব) মো. মোস্তফা কামাল মজুমদার আমার সংবাদকে বলেন, ভাণ্ডারের বিনোদ চন্দ্রের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলো নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে। আর প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে ডিএসসিসির সহকারী সচিব-২ কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

পরে কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রতিবেদনটি এখনো আমাদের হাতে রয়েছে, এটি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার হাত হয়ে মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের কাছে যাবে। মেয়রের স্বাক্ষর শেষে প্রতিবেদনটি দুদকে জমা দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত