শিরোনাম

ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বার্ধক্য

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ   |  ০৬:৪২, অক্টোবর ১৬, ২০১৯

মানুষের গড় আয়ু দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু চাকরি থেকে অবসরের বয়স বাড়ছে না। যে কারণে দিন দিন প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এভাবে দেশের প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও এদের নিয়ে স্থায়ী কোনো পরিকল্পনা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমাজ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এদের নিয়ে এখনি যদি সঠিক পরিকল্পনা না করা যায় তাহলে দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে তারা। ইচ্ছে করলেই প্রবীণদের জ্ঞানকে পুঁজি করে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো গেলে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না। সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশের প্রবীণদের নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা রয়েছে।

জানা গেছে, বর্তমানে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও আর মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে প্রবীণদের মোট সংখ্যা অপ্রাপ্তবয়স্কদের ছাড়িয়ে যাবে। প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকলেও ভবিষ্যতে এই জনগোষ্ঠীর সেবা ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং জনবল এখনো অপ্রতুল।

বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞানের সূত্র মতে— বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ প্রবীণ জনগোষ্ঠী রয়েছে।
৬৫ বা ৬২ বছরের বেশি বয়সি মানুষকে বাংলাদেশে প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে বাংলাদেশে বতর্মানে মানুষের গড় আয়ু ২০১৬ সালে যেখানে ছিলো ৭১.৬ বছর, ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭২ বছরে। পুরুষদের গড় আয়ু ৭০.৩ থেকে উন্নীত হয়েছে ৭০.৬ বছরে। আর নারীদের গড় আয়ু ৭২.৯ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩.৫ বছর।

এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই বাড়ছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও মানুষের গড় আয়ু আরো বাড়বে বলেই ধরে নেয়া যায়। এই হারে বাংলাদেশে ২০২৫ সালের মধ্যেই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে যাবে, যার একটি বিশাল প্রভাব পড়বে শ্রমবাজারের ওপর।বাংলাদেশে এখন ৬৮ শতাংশের বেশি মানুষ কর্মক্ষম।কিন্তু তিন দশক পরে প্রবীণদের সংখ্যা আরো বেড়ে গেলে দেশের সার্বিক উৎপাদনেও একটি বড় ঘাটতি দেখা দেবে।

২০১৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রবীণদের ৫৮ শতাংশের দারিদ্র্যের কারণে মৌলিক চাহিদা পূরণেরই সামর্থ্য নেই। সেখানে তাদের বৃদ্ধ বয়সে অন্য সেবা পাওয়াটা যে কতটা কঠিন তা বলাই বাহুল্য। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের কিছু কার্যক্রম রয়েছে। সবচেয়ে বড় কার্যক্রমটি হচ্ছে বয়স্ক ভাতা, যার আওতায় সাড়ে ৪৪ লাখ প্রবীণকে মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেয়া হচ্ছে।

এছাড়াও ২০১৩ সালে ষাটোর্ধ্বদের সিনিয়র সিটিজেন ঘোষণা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে চিকিৎসাসহ নানা ক্ষেত্রে প্রবীণদের অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাওয়ার কথা। যদিও এখনো এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৩ সালেই সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দেখভাল বাধ্যতামূলক করে বাবা-মাকে ভরণ-পোষণ আইনও পাস হয়েছে। কিন্তু এর প্রয়োগও খুব কম এবং এ নিয়ে সচেতনতারও অভাব রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য শুধু সরকারি সাহায্যই সীমিত নয়, বেসরকারিভাবেও প্রবীণদের নিয়ে খুব বেশি কাজ হয় না। অন্ততঃ যতটা হওয়া উচিত ততটা যে হচ্ছে না, সেবিষয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রায় সবাই একমত। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রবীণদের জন্য সরকারিভাবে বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে মাত্র একটি। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা কিছু বৃদ্ধাশ্রম মিলিয়ে খুব অল্প কিছু প্রবীণের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে বৃদ্ধবয়সে সেবা দেয়ার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবাদানকারীও নেই। যেটা ভবিষ্যতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।

বৃদ্ধ বয়সে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এমন অনেক প্রবীণ রয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থার উন্নতি না হলে ভবিষ্যৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য যে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে, তা বেশ নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তবে বিশেষজ্ঞদের কথায় এটাও স্পষ্ট যে এ অবস্থা মোকাবিলা করাও সম্ভব। আর এ জন্য সচেতনতা তৈরি, সামাজিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধ, বিনিয়োগ ও পেশাদারিত্ব— কোনো ক্ষেত্রেই ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞানের মহাসচিব অধ্যাপক আতিকুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, বার্ধক্য এমন একটি বিষয় যা প্রত্যেকের জীবনেই আসবে। এটাকে বরণ করার জন্য আমাদের তরুণ বয়স থেকেই পদক্ষেপ থাকা উচিত। বর্তমানে প্রতিটি ছেলেমেয়ে নিজের কর্মের কারণে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়। সুতরাং আমি বৃদ্ধ হলে ছেলেমেয়েরা আমাকে দেখাশোনা করবে এ চিন্তা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। দেশে বার্ধক্য ভয়াবহ রূপ নিলেও এ বিষয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় যা করছে তা হচ্ছে কিছু সহায়ক প্রকল্প। তাদের জন্য স্থায়ী কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন করা হলে এ পদক্ষেপ আরো ত্বরান্বিত হবে বলে আশা রাখি। বাংলাদেশে বৃদ্ধশ্রম সম্পর্কে বলেন, আর প্রবীণ নিবাস বলেন এটা খুবই কম। এটা বাস্তবায়ন সম্ভবও না।

তার এখানে মাত্র ৫০ জন প্রবীণ থাকার সুবিধা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রবীণ সমস্যা যত দিন যাচ্ছে ততই ভয়াবহ হচ্ছে। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা এক কোটি ৫০ লাখ। ২০২৫ সালে তা হবে দুই কোটি। ২০৫০ সালে তা হবে সাড়ে চার কোটি। ২০৬১ সালে হবে সাড়ে পাঁচ কোটি। তখনই সেটা দেশের অর্থনীতির জন্য বুঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই এ বিষয়ে এখন থেকেই পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সচেতনতার ফলে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। সাথে সাথে কিছু সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। আধুনিকায়নের ফলে এখন পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় থাকে। ফলে তাদের দেখার মতো কেউ থাকে না। ফলে অর্থনৈতিক,মনোসামাজিক ও সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পরিবারের বন্ধনকে বাড়াতে হবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে পরিকল্পনা করে প্রবীণদের জন্য স্থায়ী একটি সমাধান বের করতে হবে। অন্যথায় তারা দেশের বুঝা হয়ে দাঁড়াবে।

এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নূরুল কবির আমার সংবাদকে বলেন, প্রবীণ উন্নয়নে একটি ফাউন্ডেশন করা হচ্ছে। প্রতি জেলায় একটি করে শান্তি নিবাস করা হচ্ছে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের মহা পরিকল্পনা রয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত