শিরোনাম

সানোফির ব্যবসা বন্ধে লুকোচুরি

প্রিন্ট সংস্করণ॥মাহমুদুল হাসান   |  ০৭:২২, অক্টোবর ১৭, ২০১৯

সানজিব কুমার চক্রবর্তী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সানোফিতে কর্মরত। চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ থেকে সানোফির ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার সংবাদ দেখে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে রীতিমতো চিন্তায় পড়ে যান তিনি। তার মতো অন্যরাও বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের কান্ট্রি চেয়ার ও জেনারেল ম্যানেজার এবং ম্যানেজিং ডাইরেক্টর বিষয়টিকে গুজব বলেও উড়িয়ে দেন।

এরপর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, তারা বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে না। বিষয়টি যেহেতু আলোচনায় এসেছে তাই তারা আর গুজব বলে উড়িয়ে দিতে পারেননি। মনে মনে দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে তাদের। চালিয়ে গেলেন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা। একপর্যায়ে তারা স্বীকারও করলেন সানোফি বাংলাদেশে আর ব্যবসা পরিচালনা করবে না।

তখন সানজিব কুমার চক্রবর্তীদের মতো কর্মরত এক হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সানোফির সঙ্গে আলোচনায় বসলে তারা অভয় দিয়ে বললেন, সানোফি মালিকানা নয় বরং তাদের শেয়ার হস্তান্তর করবে মাত্র। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তারা এমন প্রতিষ্ঠানের কাছে মালিকানা হস্তান্তর করবে যারা সানোফিতে কর্মরতদের সম্মানজনক মর্যাদা দিয়ে রাখবে। এছাড়াও তাদের দেনা-পাওনার বিষয়গুলোও তারা দেখবে। এসব কথায় বিশ্বাস রাখা আর সম্ভব হয়নি সানজিবের মতো অসংখ্য সানোফি কর্মীর। তাই তারা তাদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে প্রতিদিনই সানোফির প্রধান কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচি পালন করছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেও সেগুনবাগিচায় সানোফির প্রধান কার্যালয়ে শান্তি অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে তারা। এমন পরিস্থিতিতে গত বুধবার সানোফি মালিকানা নয় শেয়ার হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়ে বসে। সেখানে কর্মীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে আলোচনা করা হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছে এটা তাদের শুভঙ্করের ফাঁকি!পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ঘোলাটে হচ্ছে। এক হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের দেনা-পাওনা ও চাকরি হারানোর শঙ্কায় আছে।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, আমরা সানোফির কর্মী। আমাদের সঙ্গে সানোফি দেনা-পাওনা মিটিয়ে তারপর মালিকানা কিংবা শেয়ার হস্তান্তর করুক। এর বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেবো না। আমরা সানোফির কোনো স্থাবর সম্পত্তি নই যে, তারা আমাদের অনুমোদন ছাড়া আমাদের গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ড ফান্ডসহ নানা বিষয়ের হিসাব অন্যের ঘাড়ে তুলে দেবে। এমন পরিস্থিতিতে গত ১৩ অক্টোবর সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেড শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়ন জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে লাভজনক সানোফিকে বন্ধ না করাসহ ১৩ দফা দাবি পেশ করে। সেই সাথে এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আজ শুক্রবার সানোফির টঙ্গি কারখানার সামনে সড়ক অবরোধেরও ঘোষণা দেয়।

ওই সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয় প্রতিবেশী একটি দেশের নাগরিক কান্ট্রি চেয়ার অ্যান্ড জেনারেল ডাইরেক্টর হওয়ার পর থেকে এ সংকট শুরু হয়। আমাদের মনে হচ্ছে, তিনি এ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রতিবেশী দেশে নিতে চাইছে। এরপর নিজেদের অধিকার আদায়ে ঢাকায় সানোফি ওয়লফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ব্যানারে আন্দোলন শুরু করে সারা দেশে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তাদের এই আন্দোলনের প্রধান দাবি— সানোফি বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হলে প্রথমে ১১শ শ্রমিক-কর্মকর্তাদের যাবতীয় ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এছাড়া কোনো মালিকানা কিংবা শেয়ার হস্তান্তর তারা মেনে নেবে না।

ব্যবসা গুটিয়ে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান জিএসকের চলে যাওয়ারও উদাহরণ আছে ফ্রান্সভিক্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সানোফি যেমন দেশের অসুস্থ বা নৈরাজ্যপূর্ণ বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ব্যবসা করা সানোফির গ্লোবাল নীতি পরিপন্থি। তাই তারা এ দেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে চায় না। এমন কথা জানিয়ে দেশ ছাড়ছে। ঠিক তেমনিভাবে ২০১৮ সালের অক্টোবরে এসব বিষয়ে লম্বা অভিযোগ দিয়ে দেশের ব্যবসা গুটিয়ে নেয় জিএসকে বাংলাদেশ লিমিটেডের ফার্মা ইউনিট।

কিন্তু তারা তখন দুই বছরে ৩০ কোটি টাকা লোকসানের কথাও বলে। কিন্তু সানোফি তেমন পরিস্থিতিতে নেই। তবুও সানোফি তার কর্মীদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলেই বসতে পারছে না। অথচ জিএসকে যাওয়ার সময় তাদের কর্মীদের জন্য একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, কেউ যদি কোম্পানি বন্ধের আগে স্বেচ্ছায় অবসরে যান, প্রতিষ্ঠান বন্ধের আগে কেউ যদি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সরকারি বিধি মোতাবেক গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন ছাড়াও ১৫ থেকে ৭০ মাসের গ্রোস বেতন দেয়া হবে। সব কর্মীকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের বিশেষ সুবিধা প্রস্তাব করা হয়েছিল। এসব বিষয়ে জিএসকে বলেছিল, তাদের কাছে টাকার চেয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখা বেশি জরুরি বলে তারা কর্মরত শ্রমিকদের জন্য এত সুবিধা প্রদান করলো।

সানোফি ওয়লফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন আমার সংবাদকে বলেন, সানোফি সুকৌশলে আমাদের ঠকিয়ে দেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চাইছে। আমাদের ১১শরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্র্যাচুইটির হাজার কোটি টাকার হিসাব না চুকিয়ে তারা লুকোচুরি করছে। এ বিষয়ে সুরাহা ছাড়াই লোকাল কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের মালিকানা হস্তান্তরের চেষ্টা করছে। তারা চাইছে আমাদের দেনা-পাওনা মিটিয়ে না দিয়ে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেশ ছাড়তে। এটা কোনো যৌক্তিক সমাধান হতে পারে না। আমরা এর সমাধান চাই। আমাদের ক্ষতিপূরণ চাই। আমরা সানোফির কর্মকর্তা-কর্মচারী আছি। দেনা-পাওনাও সানোফি মিটিয়ে দেবে। অন্যের দ্বারে ঘুরতে পারবো না। এসব বিষয়ে এখনো আমাদের কিছুই জানানো হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা সানোফির মতো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে এতদিন ধরে কাজ করছি। সানোফি চলে যাওয়ার কারণে আমাদের ব্যক্তিজীবনে সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হোক সেটা চাই না। সানোফির ব্যবসা গুটানো নিয়ে লুকোচুরি দেখে মনে হয়, তারা আমাদের পথে বসিয়ে দিয়ে চলে যাবে। তাই আমাদের দাবি পূরণ করে তারপর সানোফির মালিকানা আর শেয়ার যাই বলুক তা হস্তান্তর করুক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মী বলেন, আমরা সানোফির শর্তে বিক্রি করা কোনো প্রতিষ্ঠানেও যোগদান করবো না। যাদের কাছেই মালিকানা হস্তান্তর করুক তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো সেই প্রতিষ্ঠানে যোগদান করবো কি করবো না। সানোফি তার স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে পারে কিন্তু মানুষ নয়। এর আগে টেলিকমিউনিকেশন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন, বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জিএসকেসহ অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দেশের মালিকানা হস্তান্তর করেছে। তেমনিভাবে সানোফিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে শ্রম আইন অনুসারে মালিকানা হস্তান্তর করবে এমনটাই প্রত্যাশা করছি।

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ব্যবসা গুটিয়ে নয়, এই কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। এটিকে প্রতিরোধ করতে হবে। কারণ এ কোম্পানি যখন বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করে, তখন কিছু শর্ত পালন করেছে। আর চলে যাওয়ার জন্যও শর্ত মানতে হবে। যে কেউ চাইলেই বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি করণীয় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানি রাজি না হলে তাদের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।

ব্যবসা বিক্রির সিদ্ধান্ত জানিয়ে গত বুধবার সানোফি বাংলাদেশের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. মুইন উদ্দিন মজুমদার এক বিবৃতির মাধ্যমে জানায়, নিজেদের ব্যবসার পোর্টফোলিও পুনর্গঠন, উদ্ভাবনের ধারা বজায় রাখতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে সানোফি প্রতিনিয়ত তার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এনে থাকে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশে ব্যবসার সম্ভাবনা পুরোপুরিভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সানোফি তার সেরা অবস্থানে নেই। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্যই সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেডে থাকা শেয়ার মালিকানা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এমন একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের সন্ধান তারা করছে, যেটি নৈতিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সানোফির পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেবে। পাশাপাশি ক্রেতা ও সানোফি বাংলাদেশের কর্মীদের কল্যাণে কাজ করে যাবে। শেয়ারের মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কমপক্ষে ১২ থেকে ১৮ মাস লাগতে পারে।

বিবৃতিতে তিনি আরও জানান, এটি বৈশ্বিক লিগ্যাসির অংশ। অন্যান্য দেশে ব্যবসায় পরিচালনা ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে যে ধরনের নিয়ম মানা হয় বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সরিয়ে নেয়া কিংবা মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম অনুসরণ করা হবে। কর্মীদের ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে। ভবিষ্যতে যে প্রতিষ্ঠান এর দায়িত্ব নেবে তাদের সঙ্গেও এ বিষয়ে সতর্কভাবে এগোবো। আমাদের লক্ষ্য থাকবে, আমরা যেভাবে এ দেশে ব্যবসা করছি, ঠিক সেভাবেই নতুন প্রতিষ্ঠান কাজ করবে। সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেডে থাকা নিজেদের শেয়ার মালিকানা হস্তান্তর করলেও কর্মীদের চাকরির শতভাগ নিশ্চয়তা নিশ্চিত করবে সানোফি। এ লক্ষ্যে সামষ্টিকভাবে চাকরি স্থানান্তরের বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি মালিকানা হস্তান্তরের সময় থেকে পরবর্তী ১২ মাস পর্যন্ত চাকরির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করবে সানোফি।

ব্যবসা বিক্রি ও কর্মীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলতে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সানোফি বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়ে যাওয়া হলে কান্ট্রি চেয়ার অ্যান্ড জেনারেল ম্যানেজার রামপ্রসাদ ভাট ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মুইন উদ্দিন মজুমদার কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য যে, ১৯৫৮ সালে ৩৬ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে টঙ্গীতে কারখানা প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে ফ্রান্সভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি সানোফি বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করে। যেখানে ৪৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের। বাকি অংশের মালিকানা সানোফির। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে পরিচালিত এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৮ সালে দীর্ঘ এ সময়ে এখন পর্যন্ত কোম্পানিটি কখনো ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি। চলতি বছরও তারা ৭২ কোটি টাকারও অধিক মুনাফা করেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত