শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

৯ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

আশরাফুল আলম আপন, বদরগঞ্জ (রংপুর)

ফেব্রুয়ারি ২২,২০২০, ০৫:০৩

ফেব্রুয়ারি ২২,২০২০, ০৫:১৫

ধান রোপনের পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন

শতাধিক কৃষকের আর্তনাদ, মন গলছে না ডিজিএমের!

রংপুরের বদরগঞ্জের রাধানগর ইউনিয়নের দিলালপুর প্রধানপাড়া গ্রামের একটি সেচ পাম্পের বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন করে দেয়ায় হয়েছে। নিয়ম না মেনে সেচ পাম্প বসানোর অভিযোগ এনে ওই সংযোগ বিছিন্ন করে করে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ। এ কারণে জমিতে সেচ দিতে পারছে না শতাধিক কৃষক।

ফলে প্রায় জমির ২০ একর বোরো ধান ক্ষেত ফেটে গেছে। কৃষকেরা বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়ার জন্য স্থানীয় বিদ্যুৎ কার্যালয়ে ধর্ণা দিলেও কিছুতেই মন গলছে না ডিজিএম হামিদুল হকের। সেখানে দু’একদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া না হলে ওই সব জমির ধান গাছ মারা যাওয়ার আশংকা করছেন কৃষকেরা। এ কারণে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চাপা ক্ষোভ।

বিধি না মেনে সেচ পাম্প চালানোর অভিযোগ এনে গত মঙ্গলবার ওই গ্রামের জয়নাল আবেদিনের সেচ সংযোগ বিছিন্ন করে দেয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সংযোগ বিছিন্ন করার আগে ওই সেচ পাম্প থেকে এলাকার শতাধিক কৃষক বোরো চারা রোপন করেন।

রংপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২ এর বদরগঞ্জ জোনাল কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) হামিদুল হক বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী যে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে মিটার বসবে তার ১২০ ফিটের মধ্যে সেচ পাম্প বসাতে হবে। কিন্তু জয়নাল আবেদিন তা না মেনে ৫০০ ফিট দুরে পাম্প বসিয়ে ছিলেন। এ কারণে তার বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন করা হয়েছে।’

জয়নাল আবেদিন বলেন, সেচ মিটার ২০০০ সালে ১৫ জানুয়ারি আমার বাবা মোশারফ হোসেনের নামে নেয়া হয়েছে। তখন থেকে সেচ পাম্প চালাচ্ছি। দু’বছর আগে বাবা মারা যান। বাবার নামেই মিটার রয়েছে। জয়নাল আবেদিন অভিযোগ করে বলেন, ‘ ২০ বছর পর এসে বিদ্যুৎ অফিস বিধি দেখালো। অনেকেই তো আমার ৪০০ ফিটের চেয়েও এক হাজার থেকে দুই হাজার ফিট দুরে তার টানিয়ে সেচ পাম্প বসিয়েছেন।

কিন্তু সেগুলোতে তো বিধি দেখাছেন না ডিজিএম। মনে হচ্ছে তিনি কারও মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে আমার সংযোগ বিছিন্ন করেছেন।’ তিনি বলেন, যারা আমার সেচ পাম্প থেকে বোরো ধান চাষ করছেন, আমি কারও কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেই না। বিদ্যুৎ বিল যা আসে সবাই মিলে সেই বিল পরিশোধ করি।’

শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, ওই পাম্পের আওতায় লাগানো বোরো ধান গাছের জমি সেচ অভাবে ফেটে গেছে। কোনো কোনো জমির ধান গাছ শুকে মারা যাচ্ছে।

দিন মজুর আনছার আলী (৬০)। তিনি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ২৫দিন আগে ৬০ শতক জমিতে ধান চাষ করেছেন। এখন পর্যন্ত তিনি জমিতে সার, চাষ ও চারা রোপনে খরচ করেছেন আট হাজার টাকা। এর মধ্যে তিনি তিন হাজার টাকা নিয়েছেন সুদের ওপর। ধান মাড়াইয়ের পর তাকে দিতে হবে সুদের লাভসহ সাড়ে চার হাজার টাকা।

কিন্তু ওই পাম্পের সংযোগ বিছিন্ন করে দেয়ায় তার ধান গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। জমিতে এখন পর্যন্ত ইউরিয়া দিতে পারেননি। দু’একদিনের মধ্যে সেচ দিতে না পারলে তিনি ধান গাছ বাঁচাতে পারবেন না। ধান না হলে তিনি জমির মালিককে কি দিবেন এবং সুদের টাকা পরিশোধ করবেন কিভাবে? এই চিন্তা এখন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

তিনি এ প্রতিবেদককে দেখে বলেন, ‘স্যার, হয় কারেন্ট দেন ধানগাছ বাচাই, না হয় হামার গলা টিপে ধরেন, মরি যাই।’ কৃষক মিন্টু মিয়া (৩৫) বলেন, ‘মুই ২৫দিন আগোত এক বিঘা (৬০ শতক) ভুঁইয়োত (জমি) ধান গাছ গারচু। আইজও ভুঁইয়োত ইউরিয়া দিবার পারও নাই। সাতদিন মর্টার পাম্প নষ্ট হয়া পড়ি আচ্ছলো। ভালো করি যেদিন ভুঁইয়োত (জমি) নাগাবে ঠিক সেইদিনে কারেন্টের (বিদ্যুৎ) লোক আসি কারেন্ট কাটি দেচে। ১২দিন ধরে পানি দিতে না পারায় গাছ শুকি যাওচে। ডিজিএম স্যারের হাত-পাও ধরিও কারেন্ট পাওচি না।

বুঝি ধান গাছ আর বাচানো যাবার ন্যায়।’ শুধু ওই দুই কৃষকের নয়, ওই পাম্পের আওতায় কৃষক আব্দুস সালামের ২৪ শতক, ভুট্টু মিয়ার ১৮ শতক, সুকারু মিয়ার ৬০ শতক, জাহাঙ্গীরের ২৫০ শতক, জুয়েলের ৩০ শতক, আসাদুজ্জমানের ৩০ শতক, হাবিবুরের ৬০ শতক, বুলবুলের ৩৪ শতক, আনারুলের ৪৮ শতক, হালিমের ৩০ শতক ও জোবায়দুরের ৩০ শতকসহ শতাধিক কৃষক ওই পাম্পের আওতায় ধান চাষ করে বিপাকে পড়েছেন।

কৃষক তোফাজ্জল হোসেন (৬০) বলেন, ‘আমার দেখা মতে এলাকার একটি সেচ পাম্পও ১২০ মিটারের মধ্যে নাই। যদি এই আইন মেনে জয়নালের বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন করা হয়, তাহলে অন্যগুলো হচ্ছে না কেন? ওইসব কি চোখ দিয়ে দেখছে না বিদ্যুতের লোকজন? নাকি ঘুষ পেয়ে তাদের চোখ বন্ধ হয়ে গেছে?’

সরেজমিনে দেখা যায়, জয়নাল আবেদিনের পাশে আরও একটি সেচ পাম্প দিয়ে পানি উঠছে। সেই পাম্পে বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়া হয়েছে প্রায় ৮০০ ফিট দুরে থেকে। রহস্যজনক কারণে সেই পাম্পের বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন করা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিজিএম হামিদুল হক কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা মো. জোবায়দুর রহমান বলেন, ‘ওই ঘটনায় কেউ আমার কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তবে আজ শনিবার বিষয়টি লোক মুখে শুনে সেখানে সংশ্লিষ্ট উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, ‘জমিতে বোরো ধান লাগানোর পরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন করার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তাদেরকে বোরো ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত সুযোগ দেয়া উচিত ছিল বিদ্যুৎ বিভাগের।’

মুঠোফোনে রংপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জোনাল কার্যালয়ের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আলী হোসেন বলেন, ‘বিধি ভঙ্গ করে কেউ সেচ পাম্প চালালে তার সংযোগ বিছিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। এতে কারও বোরো ক্ষেত নষ্ট হলে সেটা দেখার দায়িত্ব বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষর নয়।’

আমারসংবাদ/এমআর