বৃহস্পতিবার ০২ এপ্রিল ২০২০

১৯ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ২৩,২০২০, ০১:০১

ফেব্রুয়ারি ২৩,২০২০, ০১:০১

দফায় দফায় বাড়ছে চালের দাম

কৃষক ধানের পর্যাপ্ত দাম না পেলেও লাফিয়ে বাড়ছে চালের দাম। মাঝখানে চালের বাজার স্থিতিশীল হয়েছিল। গত সপ্তাহে কেজিতে চার থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, বস্তাপ্রতি চালের দাম বাড়ায় খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। ঢাকার পাইকারি ও খুচরা বাজারে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও সরুসহ সব ধরনের চালের দাম বিক্রি বেড়েছে।

গতকাল শনিবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মিরপুর-১ নাম্বর মার্কেটে জনতা রাইস এজেন্সি ১৫ দিন আগে ৫০ কেজি চালের বস্তা ১৫শ টাকায় বিক্রি করতেন, এখন সেই একই বস্তা ২০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি করছেন।

অথচ দুই মাস আগেই বাজারে এসেছে আমন ধান, যা থেকে বিভিন্ন ধরনের মোটা জাতের চাল হয়। দাম বাড়ার পর এখন মিনিকেটের ৫০ কেজির বস্তা দুই হাজার ৩৫০ টাকা করে কিনতে হচ্ছে।

প্রতি বস্তায় ৫০ টাকা খরচের পর বিক্রি করতে হচ্ছে দুই হাজার ৪০০ টাকার উপরে। মাঝখানে মিলে মিনিকেটের বস্তা দাম দুই হাজার ১৫০ টাকায় নেমেছিল। নতুন মৌসুমের মোটা চালের দামও ৩০ থেকে ৪০ টাকা করে বেড়েছে।

নতুন মৌসুমে আটাশ চালের দাম ৫০ কেজির বস্তা এক হাজার ৫৫০ টাকা, গত বছরের পুরাতন আটাশ এক হাজার ৭২০ টাকা। স্বর্ণা ও গুটির দাম ৫০ টাকা করে বেড়েছে। স্বর্ণা এক হাজার ৪৫০ টাকা, গুটি এক হাজার ৩৫০ টাকায় ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে।

পাইকারি বাজারে মিনিকেট চাল প্রতি কেজি ৪৮ টাকা থেকে ৫৯ টাকা হলেও খুচরায় তা বিক্রি হচ্ছে ৫৩ টাকা থেকে ৫৪ টাকায়। আর রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে জাত ও মানভেদে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল (সাধারণ) বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৫ টাকায়, মিনিকেট (উত্তম) বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিলো ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা।

নাজিরশাইল প্রতি কেজি (ভালো) ৬০ থেকে ৬২ টাকা, সাধারণ ৫৪ থেকে ৫৮ টাকায়, মাঝারি মানের পাইজাম ও লতা ৪২-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা আগে বিক্রি হতো ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। মোটা স্বর্ণা ও ইরি চাল ৩২-৩৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে। যা এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৩২-৩৫ টাকা।

চালের দাম পর্যবেক্ষণ করে গবেষক ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বোর মৌসুমে কৃষক ধানের দাম ও শ্রমিক না পেয়ে ক্ষেতে আগুন লাগিয়েছে। এটি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, কৃষক ধানের না পেলেও বাজারে চালের দাম বাড়ছে।

এতে মধ্যস্বত্বভোগী মিলমালিক ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়েছেন। ছয় মাস ধরে ধান-চালের দাম ক্রমাগতভাবে নিচে নামছিল। অবশ্য এক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি পাল্টেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে ছয় লাখ টন ধান ও চার লাখ টন চাল কিনবে সরকার।

এর মধ্যে সিদ্ধ চাল কেনার লক্ষ্য রয়েছে তিন লাখ টন। আতপ চালের ক্রয় লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার টন। এ ক্ষেত্রে প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহমূল্য ধরা হয়েছে ২৬ টাকা করে। এ ছাড়া কেজিপ্রতি সেদ্ধ চাল ৩৬ টাকায় ও আতপ চাল ৩৫ টাকায় সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ডিসেম্বরে শুরু হওয়া এ চাল সংগ্রহ অভিযান চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কারওয়ান বাজারের পাইকারি চালের আড়ত আল্লাহর দাম রাইস এজেন্সির মালিক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মিলমালিকরা চালের দাম বাড়ানোর সুযোগ খুঁজে। চালের দাম বেড়ে গেছে বলে দাম বেশি নিচ্ছে।

এতে করে আমাদের মতো পাইকারি ব্যবসায়ীদের তাদের কাছ থেকে বেশি দামে চাল কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে। কারওয়ান বাজারে আরেক চাল ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন মোল্লা বলেন, আমরা পাইকারি আনি মিল মালিকদের থেকে। তারা দাম বাড়ালে আমাদেরকেও বাড়াতে হয়। দাম বাড়ছে কেন এর জবাব মিলাররা ভালোভাবে বলতে পারবেন।

তবে এ ব্যাপারে মিলমালিকরা দাবি করছেন, আমাদের কাছে বস্তা প্রতি ৫০ টাকা বাড়লে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা এর চেয়ে কয়েকগুণ চালের দাম বাড়ায়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন দরপতনে থাকায় চালের দাম ধীরে ধীরে ‘স্থিতিশীল’ অবস্থার দিকেই আসছে।

চালের বৃদ্ধির বিষয়ে নওগাঁ জেলা চালকল সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন বলেন, গত দুই বছর ধরেই ধান ও চালের দাম অনেক কম ছিলো। ফলে কৃষকরা লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন ব্যয়ও সামাল দিতে পারেননি। দাম না পেয়ে ইতোমধ্যে অনেক কৃষক চাষাবাদ ছেড়ে দিয়েছেন। এটি বাজারের জন্য খুবই খারাপ খবর। দাম না বাড়ালে কৃষকদের চাষে ফেরানো যাবে না।

মিলমালিক ফরহাদ হোসেন বলেন, মোটা চালের দাম সরকার নির্ধারিত প্রতিকেজি ৩৬ টাকায় উন্নীত করতে হলেও ৫০ কেজির বস্তার দাম উঠা উচিত ১৮০০ টাকায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে মোটা চালের ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৩০০ টাকা থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায়।

এর কারণ হচ্ছে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক বেড়ে যাওয়া। চালের বাজারের নিয়ন্ত্রণে মিলমালিকদের ওপর নজরদারিতে গুরুত্বারোপ করেছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে বেঁচে থাকার জন্য জরুরি এ খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।

তবে চালের এ দাম বৃদ্ধিকে স্বাভাবিক মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, প্রতি বছর এ সময় বিশেষ করে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ধানের সরবরাহ কম থাকে। তাই সব ধরনের চালের দাম বেড়ে যায়। এপ্রিলে নতুন ধান আসে তখন আগের দামে ফিরে আসে।

এ বিষয়ে বাবুবাজার চাল ব্যবসায়ী সমিতির সেক্রেটারি নিজাম উদ্দিন বলেন, প্রতি বছর এ সময় চালের দাম একটু বেশি থাকে। তাই এটা স্বাভাবিক বিষয়। কারণ এখন কোনো ধানের মৌসুম নয়। ধানের সংকটের জন্যই দাম বেড়েছে। আর পুরনো চাল প্রায় শেষ। নতুন চাল আসতে আসতে আরো দুই মাস লাগবে। তাই এপ্রিলের আগে আর চালের দাম কমবে না। এখানে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কোনো হাত নেই।

তবে দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে মিলমালিকদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, মিলগেটে এক টাকা দাম বাড়লে তার প্রভাব খুচরা বাজারে চার থেকে পাঁচ টাকা পড়ে। মিল থেকে বেশি দামে কিনে আমাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রপ্তানির অনুমোদন দেয়ার পর চালের দাম একদফা বেড়েছিল।

গত ৩১ জানুয়ারি চালের রপ্তানি মূল্যের ওপরে ১৫ শতাংশ প্রণোদনা দেয়ার পর দাম ফের বাড়তে শুরু করে। চলতি সপ্তাহে চালের দাম আবারো আরেক দফা বেড়েছে। মূলত রপ্তানির অনুমতি নিতে আসা প্রতিষ্ঠানগুলো সরু ও সুগন্ধী চাল রপ্তানির অনুমোদন চেয়েছে।

তাই চাল রপ্তানি শুরু হলে দাম আরো বেড়ে যেতে পারে। এতে দাম হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ারও ঝুঁকি আছে। এ পরিস্থিতিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে চাল রপ্তানির ব্যাপারে আপত্তি তোলা হয়। এ কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আপাতত রপ্তানির অনুমোদন দেয়া থেকে বিরত রয়েছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক মাসে শুধু সরু চালের দামই পাঁচ শতাংশ বেড়ে গেছে।

সাধারণ মানের নাজির ও মিনিকেট কেজি ৫০-৫২ টাকা, উত্তমমানের নাজির ও মিনিকেট ৫৫-৬০ টাকা, মাঝারি চাল ৪২-৫০, পাইজাম ও লতা (সাধারণ মানের) ৪২-৪৫, পাইজাম ও লতা (উত্তমমানের) ৪৬-৫০ এবং স্বর্ণা ও চায়না ইরিখ্যাত মোটা চাল ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সরকারি গুদামে বর্তমানে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন চাল মজুদ আছে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ