বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট ২০২০

২১ শ্রাবণ ১৪২৭

ই-পেপার

রায়হান আহমেদ তপাদার

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ১০,২০২০, ০৬:১২

ফেব্রুয়ারি ১৭,২০২০, ০৩:১৮

তারুণ্যের মানসিক সমস্যায় সোশ্যাল মিডিয়া

সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তরুণরা সমাজে ভালো-মন্দ দু’ধরনের ভূমিকাই রাখছে? তবে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, দিনের খুব বড় একটা সময় এই মাধ্যমে ব্যস্ত থাকায় তরুণদের অলসতা বাড়ছে? শিশুরা ঘরে থাকে? এখন তাদের বিনোদনের মাধ্যম বলতে সোশ্যাল মিডিয়া? সেখানে তারা চ্যাট করছে, আড্ডা দিচ্ছে?

এর ফলে ব্যক্তি যোগাযোগ ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? এর কিছু ভালো দিক আছে? যেমন এবারের বইমেলায় আমার চারটি বই বের হয়েছে? সেটা আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে দিলাম, আমার পাঁচ হাজার বন্ধু সেটা দেখল, তারা বইটা নিয়ে সমালোচনা করল, আলোচনা করল, তাতে আমি সমৃদ্ধ হলাম? তবে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আবেগের চাপ থাকলে সেটা একটু রিলিজ করে? আর অপজিট সেক্সের প্রতি দুর্বলতা আমাদের সহজাত প্রবণতা?

এই সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব সহজেই মেয়েবন্ধু পাওয়া যায়, ছেলেবন্ধু পাওয়া যায়? এই যোগাযোগের কারণে মানুষের আবেগ একটা জায়গায় আবদ্ধ থাকছে না? চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে আমরা সবাই কিন্তু নিজের কথাটা অন্যের কাছে বলতে চাই? এই শেয়ার করার প্রবণতা আগেও ছিল? আগে হয়ত এটা বন্ধু-বান্ধবের কাছে বলত? এখন সেটা সে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দিয়ে দিচ্ছে? সেটা দেখে অনেকে কমেন্ট করছে, অনেক রকম মন্তব্য হচ্ছে?

সবার হাতেই যেহেতু এখন স্মার্টফোন আছে, সেই ফোনের ব্যবহার এক্ষেত্রে বেশি হচ্ছে? মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতার কারণে আমাদের অনুভূতি যুগে যুগে যেটা ছিল, সেটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? হ্যাঁ, অবশ্যই উপকার পাচ্ছে? এখানে যারা বই পড়ে, তাদের একটা গ্রুপ আছে? ওই বইগুলোতে কী আছে সেগুলো নিয়ে তারা আলোচনা করছে?

এখানে ভালো-খারাপ দু’টোই আছে? তবে সবচেয়ে খারাপ যেটা, সেটা হলো, আমাদের তরুণরা অলস হয়ে যাচ্ছে? তাদের শরীরের কর্মক্ষমতা অনেক কমে যাচ্ছে? তাদের উল্লাস করার ক্ষমতা বা হইচই করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে? তাদের মানসিক শক্তি কমে যাচ্ছে? যখনই তারা কোনো স্ট্রেসে পড়ে, সেটা থেকে উঠতে পারে না?

আমরা যখন ছোটবেলায় মাঠে খেলতে গেছি, তখন হেরে গেলে সেটা সহ্য করার শক্তি অর্জন করেছি, আবার জিতে গেলে সেটা ধারণ করার শক্তিও অর্জন করেছি? এখন যেটা হচ্ছে, আমাদের ক্রিকেট দল হেরে গেলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভয়ংকরভাবে গালিগালাজ করা হচ্ছে? আবার জিতে গেলে রাস্তায় মিছিল নিয়ে বের হচ্ছে? মানে, এই হার-জিতের মধ্যে কোনো ভারসাম্য নেই?

বিশেষ করে পরাজয় বরণ করার মতো কোনো শক্তিই তাদের মধ্যে নেই? খেলাধুলার মাধ্যমে ছোটবেলা থেকে হার-জিতের শক্তি সঞ্চিত হয়? এই সঞ্চয় তরুণ প্রজন্মের কম হচ্ছে? এতে করে তারা যে কোনো ছোটখাটো বিপর্যয়েও ভেঙে পড়ছে? এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসক্তিতে হতাশ হয়ে পড়ছে তারুণ্য। পর্নোগ্রাফি আসক্তি, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে শখ্য, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ায় বিপথগামী হচ্ছে তরুণ সমাজ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের অতি ব্যবহার শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়েরা এসব চাপের মধ্যে থাকায় ব্রেনের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা, মানিয়ে নেওয়ার শক্তি হারিয়ে হতাশায় ডুবে যাচ্ছে মানুষ। তরুণরা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ জীবনযাপনকে চাপে ফেলছে, তৈরি করছে সংকট, বাড়াচ্ছে প্রতিযোগিতা।

বৃটেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উই আর সোশ্যাল এবং কানাডাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান ‘হুটস্যুইট’ পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, পৃথিবীর যেসব শহরে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি তার মধ্যে ঢাকা দ্বিতীয়। ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকাতে সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয় ফেসবুক।

সক্রিয় ইউজার অ্যাকাউন্ট ১৮০ কোটিরও বেশি। এর ৮৭ শতাংশই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফেসবুক ব্যবহার করেন। মোবাইল ফোনে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন, এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির তালিকাতেও বিশ্বে ১০ নম্বরে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এই প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৬৯ শতাংশ হারে। এর ৫৫ শতাংশই প্রতিদিন ফেসবুক ব্যবহার করেন। ব্যবহারকারীদের ৪৪ শতাংশ নারী, ৫৬ শতাংশ পুরুষ। দ্বিতীয় স্থানে আছে ফেসবুক মেসেঞ্জার।

এরপর রয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব। এদের সক্রিয় ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্ট ১০০ কোটির ওপরে। একই জরিপে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যার ইন্টারনেট ব্যবহারের ৭৮ শতাংশই মোবাইল সংযোগনির্ভর। পৃথিবীতে প্রায় ২৭০ কোটির বেশি লোক সক্রিয়ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আধুনিক জীবনের নতুন এক বাস্তবতা। তবে শিশু-কিশোরদের মধ্যে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ২০১৭ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শ্রেণিকক্ষে সেলফোন নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ।

যদিও স্কুল পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন হচ্ছে সামান্যই। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আসক্তি রোধ করা যাচ্ছে না। এক জরিপে উঠে এসেছে, মাধ্যমিকে স্কুল চলাকালেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী আবার এটি ব্যবহার করছে পাঠদান চলাকালে।

শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অত্যধিক আসক্তি কমিয়ে দিচ্ছে পড়ালেখায় মনোযোগ। দেখা যাচ্ছে, যে সময়টুকু এখন তারা ফেসবুক কিংবা অন্যান্য সাইটে ব্যয় করছে, আগে এ সময়ে তারা পড়ালেখা করত। এ সময়ে তারা বিদ্যালয় থেকে দেওয়া বাড়ির কাজ সম্পন্ন করত কিংবা যথাসময়ে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে প্রয়োজনীয় কাজে সক্রিয় থাকত।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অধিক সম্পৃক্ততা তাদের সময়ানুবর্তিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এখন তারা সময়মাফিক সুনির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে পারছে না। এতে শিক্ষার্থীদের ফলাফল যেমন খারাপ হচ্ছে, তেমনি সার্বিকভাবে পড়ালেখায় পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তির ক্ষতি একমুখী নয়, বহুমাত্রিক। শুধু পড়ালেখা নয়, অধিক সময় ধরে মোবাইল ব্যবহারের কারণে তাদের মনোদৈহিক নানা সমস্যা তৈরি হয়।

অনেকক্ষণ স্থির বসে কিংবা শুয়ে থাকায় তাদের শারীরিক সচলতা কম হয়। ফলে ঘাড় ব্যথা যেমন হয়, তেমনি বাড়ে স্থূলতা। এতে তারা শারীরিকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে। আবার মানসিক ভাবেও তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, বিষণ্ণতা, একাকিত্ব, অপরাধ প্রবণতা। ব্যাহত হচ্ছে সামাজিকীকরণ।

বর্তমান সময়ে যোগাযোগের অন্যতম ক্ষেত্র হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ বলতে শুধু একটা সমাজের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বোঝায় না। সামাজিক যোগাযোগের পরিধি এখন সমাজ এবং রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি যুগে বিশেষ কিছু মাধ্যমের ফলে যোগাযোগকে এমন সহজ করে ফেলেছে; যা আমাদের কল্পনারও সম্পূর্ণ বাইরে।

অবশ্য বিজ্ঞজনরা বলছেন, একবিংশ শতাব্দীতে এসে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনকে অনেকভাবেই সহজ করে তুলেছে- এটা সত্যি। কিন্তু এর বিপরীত দিকও আছে। এসব মাধ্যমের প্রতি আসক্তি এমন পর্যায়ে চলে গেছে, যে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মানসপটে। বাস্তব জগৎ থেকে একটি ভার্চুয়াল জগতে জড়িয়ে পড়ায় অনেক ক্ষেত্রে তারা সম্পৃক্ত হচ্ছে ভুয়া ও কৃত্রিম সম্পর্কে।

ফলে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ভালোভাবে বিকাশ লাভ করছে না। এমনকি প্রযুক্তিনির্ভরতা ও বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব তরুণ-তরুণীদের জীবনে তৈরি করছে হতাশা। মানসিক অস্থিরতায় ভোগে বিশৃঙ্খল জীবনযাপনে জড়িয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করছে তারা। সামাজিকতা নষ্ট হওয়ায় সমাজে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা।

লেখক ও কলামিস্ট

আমারসংবাদ/এমএআই