সোমবার ৩০ মার্চ ২০২০

১৬ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

মাহমুদুল হাসান

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২০,২০২০, ১২:৪৭

মার্চ ২০,২০২০, ১২:৪৭

পরিস্থিতি অবনতির পথে

সরকার যথাসাধ্য প্রস্তুতি নিচ্ছে

শুধু প্রবাসীর শরীরে নয় করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯)। ভাইরাস এখন স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হচ্ছে। প্রতিমুহূর্তে পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে ভাইরাসটি জ্যামিতিক হারে সংক্রমিত হতে পারে। প্রবাসীদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলেই এই ঝুঁকিতে পড়েছে দেশ।

এক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতাকে একচ্ছত্রভাবে দায়ী করা হলেও দেশের নাগরিকদের দায়িত্ববোধের অভাবও একটি বড় কারণ। রোগটি এখন আর ইতালিফেরত কিংবা প্রবাসীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আশঙ্কা করা হচ্ছে, রোগটি ব্যক্তি থেকে পরিবার ও সমাজে পৌঁছে গেছে।

কারণ ইতোমধ্যে দেশে ১৮ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন ইতালি ও অন্যদেশ থেকে ফিরে আসা রোগী হলেও বাকিরা তাদের থেকে স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হয়েছেন।

ইতোমধ্যে করোনা বিশ্বের প্রায় ১৭৬টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দেশে আক্রান্ত হয়েছে অন্তত ২ লাখ ২১ হাজার ২৯০ জনের বেশি মানুষ। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চীনে আক্রান্ত। চীন এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সেখানে গতকাল পর্যন্ত পূর্বের চব্বিশ ঘণ্টায় কোনো স্থানীয় রোগী করোনা আক্রান্ত হয়নি।

তবে বিদেশ থেকে ৩৪ করোনা রোগী চীনা নাগরিককে তারা দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে। এ পর্যন্ত করোনায় মৃত্যু হয়েছে আট হাজার ৯৯৭ জনের।

সুস্থ হয়ে উঠেছে ৮৫ হাজার ৭৮৫ জন। এখনো সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন ৬ হাজার ৮৮০ জন। মোটাক্রান্তের ৯১ শতাংশ রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছে আর ৯ শতাংশ রোগীর প্রাণহানি ঘটেছে।

গতকাল দেশে চারজন নতুন করোনা আক্রান্ত শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ও তিনজন ইতালিফেরত এক রোগীর স্বজন। অপর একজন সম্প্রতি ইতালি থেকে সংক্রমিত হয়ে এসেছেন।

গত বুধবার করোনায় দেশে মৃত্যুবরণকারী সত্তরোর্ধ্ব ব্যক্তিও বিদেশফেরত এক করোনা রোগীর সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হন। পরে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আপাতত দেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে কোনো সুখবর নেই। দিনে দিনে অবস্থার অবনতি হচ্ছে। সারা দেশে গত দুমাসে সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি মানুষ বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে মাত্র পাঁচ হাজার মানুষকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা সম্ভব হয়েছে।

এ বিষয়ে সরকার এখন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে হোম কোয়ারেন্টাইনের নির্দেশনা অমান্য করায় কয়েকজনকে জেল ও জমিরানা করা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

যদি বেশিসংখ্যক লোক করোনায় আক্রান্ত হয় তাহলে তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য ইতোমধ্যে গাজীপুর ইজতেমা ময়দান প্রস্তুত করছেন। ময়দানটি ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীকে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারাও সেখানে কাজ শুরু করে দিয়েছে।

এছাড়াও রাজধানীর কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালের দুই হাজার বেড করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

এসব উদ্যোগের সাথে নতুন করে আশার মশাল জ্বেলে ধরেছে দেশেই করোনা শনাক্তের পদ্ধতি উদ্ভাবন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র নতুন এ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। এর অনুমোদনও দিয়েছে সরকার।

এখন কাঁচামাল ক্রয়ের পথে প্রতিষ্ঠানটি। সরকারের সহায়তা অব্যাহত থাকলে আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি দুই লাখের বেশি করোনা টেস্টিং কিট সরবরাহ করতে পারবে বলেও নিশ্চিত করেছে।

দেশে নতুন চার করোনা রোগী শনাক্ত
চলতি মাসের আট তারিখ থেকে দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হতে শুরু করেছে। গতকাল পর্যন্ত দেশে আঠারো করোনা রোগী চিহ্নিত হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ প্রবাসী থেকে স্থানীয়দের মধ্যে সংক্রমিত।

ফলে বুঝা যাচ্ছে প্রবাসীদের সংস্পর্শে এসে রোগটি এখন স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল শনাক্ত হওয়া চারজনের মধ্যে তিনজন ইতালিফেরত করোনা রোগীর স্বজন। অপর একজন সম্প্রতি ইতালিফেরত।

গতকার বৃহস্পতিবার দুপুরে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে তিনজনের আক্রান্ত হওয়ার তথ্য জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। এরপর বিকালে চুয়াডাঙ্গায় একজনের আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন জেলার সিভিল সার্জন।

ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, নতুন তিনজনের মধ্যে একজন নারী, দুইজন পুরুষ। তারা তিনজন একই পরিবারের সদস্য। আক্রান্ত নারীর বয়স ২২ বছর, দুই পুরুষের একজন ৩২ ও অপরজনের বয়স ৬৫ বছর। ইতালিফেরত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তারা তিনজন আক্রান্ত হয়েছেন।

আর চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এএসএম মারুফ হাসান জানান, জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা শহরের থানাপাড়ার ইতালিফেরত যুবক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, উনিশটি খোলা হটলাইনে এখন পর্যন্ত মোট ২ লাখ ২৮ হাজার ৮৩৮ জন সেবা নিয়েছে। এ পর্যন্ত ৩৬৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। আইসোলেশনে আছেন ১৯ জন। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৪৩ জন।

বিশ্বের ১৭৬ দেশে এ ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ২১ হাজার ২৯০ জন আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে ৮ হাজার ৯৯৭ জন মারা গেছেন এবং সুস্থ হয়েছেন ৮৫ হাজার ৭৮৫ জন।

গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, আজ (বৃহস্পতিবার) দুপুরে আমরা সরকারের অনুমোদন পেয়েছি। আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে কাঁচামাল দেশে পৌঁছাবে।

আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আমরা কিট উৎপাদনে যাবো। তবুও শঙ্কা কাটেনি। জনস্বার্থে সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। এলসি খোলা হয়েছে কিন্তু কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া না হলে বিমানবন্দরে পণ্য খালাশ ও সুফল ভোগ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, কিট উৎপাদনের কাঁচামাল চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ডের কাছে রয়েছে। চীন বাণিজ্যিকভাবে কিট উৎপাদনের জন্যে কাঁচামাল বিক্রি করবে বলে না জানিয়েছে।

সরকার শুল্কমুক্ত সুবিধায় এসব কাঁচামাল আনার সুযোগ দিলে আশা করছি দেশে কিট নিয়ে কোনো সংকট থাকবে না। দুই সপ্তাহ পর কাঁচামাল পেলে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পর সরকারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চার সপ্তাহের মধ্যে ২ লাখ শনাক্তকরণ কীট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে বলেও যোগ করেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, বিদেশে যারা অবস্থান করছেন, তাদের এ মুহূর্তে দেশে না আসার অনুরোধ করছি। দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

যেসব অঞ্চলে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি অবনতি হবে, সেসব অঞ্চল প্রয়োজনে লকডাউন (অবরুদ্ধ) করা হবে। সম্ভাব্য এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে মাদারীপুর, শিবচর, ফরিদপুর।

আক্রান্ত বেশি হলে তাদের চিকিৎসার জন্য টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার মাঠ প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেখানে দায়িত্বে থাকবে সেনাবাহিনী।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে সারা দেশে পাঁচ হাজার মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। বর্তমানে দুই হাজার মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজন হলে বিশ্ব ইজতেমা মাঠে বড় পরিসরে চিকিৎসাব্যবস্থা করা হবে।

তিনি বলেন, চীন করোনা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে লকডাউনের মাধ্যমে। অন্যান্য দেশও চীনকে অনুসরণ করছে। যদি আমাদের পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে এবং আমাদের কোনো এলাকা যদি বেশি আক্রান্ত হয়ে যায়, আমরাও অবশ্যই সে এলাকা লকডাউনে নিয়ে যাব।

আমাদের দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হবে করোনা থেকে। লকডাউন করাটাই আক্রান্ত এলাকার জন্য একমাত্র উপায়। যার মাধ্যমে আমরা ভাইরাসটি ছড়িয়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণে নিতে পারব।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে বোঝাবার চেষ্টা করছি। এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষকে আমরা কোয়ারেন্টাইনে রেখেছি। এটা তো আমাদের বিরাট একটা সফলতা যে, এত মানুষকে আমরা রাখতে পেরেছি। আর যারা লঙ্ঘন করছেন, তাদের জরিমানা করছি।

তাদের জেলে যেতে প্রস্তুত থাকার কথাও বলা হচ্ছে। সেই বিষয়েও আমরা ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবো না। আমরা তো এখন ভালো পরিস্থিতিতে আছি বলে মনে করি।

অন্য দেশের তুলনায় আমাদের আক্রান্তের সংখ্যা কম। মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র একজন। যিনি মারা গেছেন তার বয়স ৭০-এরও বেশি। তার কিডনি, হার্টের রোগ ও ডায়াবেটিসসহ নানা রোগ ছিলো।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ