সোমবার ৩০ মার্চ ২০২০

১৬ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

শাহ আলম নূর

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২২,২০২০, ০১:২২

মার্চ ২২,২০২০, ০১:২২

বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজে আসছে না আশ্বাস

করোনা ভাইরাসের আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করেছে কিছু ব্যবসায়ী।

এতে চাল, ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে হুহু করে। এ দুর্যোগে কোনো নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়বে না— এমন আশ্বাস দেয়া হচ্ছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।

তবে তাদের এ ঘোষণা কোনো কাজে আসছে না। কোনোভাবেই ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য ঠেকানো যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা নিয়ন্ত্রণে চলছে বিভিন্ন অভিযান।

তাতেও থেমে নেই ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর প্রবণতা। বিভিন্ন অভিযানের মধ্যেও চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব ব্যবসায়ী প্রতিটি পণ্য উচ্চ মূল্যে বিক্রি করছে।

ঢাকাসহ সারা দেশে গত দুই দিনের ব্যবধানে খুচরা বাজারে চালের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ৪ থেকে ৭ টাকা। পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩০ টাকা।

পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। গতকাল মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ মার্কেট ও মোহাম্মদপুর বাজার ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।

গতকাল মোহাম্মদপুর চালের মার্কেটে দেখা যায় পিকআপ ভ্যান সাজিয়ে রাখা হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে চাল নেয়ার জন্য।

কাওরানবাজার, বৌবাজার, নবোদয়বাজারসহ বিভিন্ন ছোট বাজার থেকে আসা এসব ভ্যানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চাল। প্রতিটি পাইকারি দোকানেই ভিড় ছিলো সকাল থেকেই। কোনো ব্যবসায়ীর কথা বলার সময় নেই। সবাই ব্যস্ত বেচা-বিক্রিতে।

ব্যস্ততার মধ্যেই রাজশাহী ট্রেডার্সের মালিক মুক্তার হোসেন জানান, চালের দাম বস্তাপ্রতি মোকামে বেড়েছে ১০০ টাকা। মিল মালিকরা দাম বাড়িয়েছে।

সেই হিসাবে কেজিতে এক টাকা বেড়েছে। মিনিকেট ৫০ কেজির চালের বস্তার দাম ছিলো ২৫০০ টাকা থেকে ২৫৫০ টাকা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ২৭০০ থেকে ২৭৫০ টাকা দরে।

খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ— চালের দাম আড়তদাররা যেভাবে পারে তাই নিচ্ছে। মোহাম্মদপুরের খুচরা ব্যবসায়ী শফিকুর রহমান আজম বলেন, ‘বস্তাপ্রতি ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা কম-বেশি রেখে দুটি ভাউচার করা হচ্ছে। বেশি দামের ভাউচারের টাকা আমাদের কাছ থেকে রাখা হচ্ছে।’

ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণ ক্রেতারা অতিরিক্ত কিনছে। যার ১০ কেজি চাল দরকার সে কিনছে ২ বস্তার বেশি। আর যার এক বস্তা চাল লাগবে সে কিনছে ১০ থেকে ২০ বস্তা। এভাবে সাধারণ ক্রেতারা বাজারে ভিড় করে কেনার কারণে কিছু ব্যবসায়ী সুযোগ বুঝে বেশি দামে বিক্রি করছে।

এদিকে করোনা ভাইরাস আতঙ্কে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি করায় গতকাল ১৪ প্রতিষ্ঠানকে ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

গতকাল সকাল ৬টায় যাত্রাবাড়ীর পেঁয়াজের আড়তে অভিযান চালিয়ে এ জেল-জরিমানা করা হয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম।

তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে জনগণের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকের মধ্যেই একদিনে কয়েক মাসের বাজার করার প্রবণতা দেখা গেছে। এই সুযোগে আমাদের কিছু ব্যবসায়ী পণ্যের দাম ৩-৪ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।’

সারোয়ার আলম বলেন, ‘আমরা দেখেছি, পাইকারি বাজারে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিলো ২৮ থেকে ৩১ টাকা।

গতকাল তারা পেঁয়াজ বিক্রি করেছে ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা কেজি। খুচরা বাজারে ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করেছে। অথচ এটা পেঁয়াজের সিজন। দেশে প্রচুর মজুত রয়েছে।

ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ফড়িয়ারা মিলে এই কাজগুলো করেছেন। এ পর্যন্ত ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ৫ জনকে ৬ মাস থেকে ১ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।’

ব্যবসায়ীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, যারা এই করোনা ভাইরাস বা মানুষের অতিরিক্ত কেনাকাটার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করবে তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় নিয়ে আসব।

এছাড়াও জনগণ ও ক্রেতাদের অনুরোধ করব আপনারা একইসঙ্গে ২-৩ মাসের বাজার করবেন না। আপনারা সর্বোচ্চ ৭ দিনের বাজার করতে পারেন। সবাই এভাবে কেনাকাটা করতে গেলে দাম বাড়াবে তারা।’

ক্রেতাদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কে কত টাকা নিচ্ছে তা নজরদারি করছি। সব ক্রেতার অনুরোধ করছি, আপনারা ভাউচার ছাড়া কেউ পণ্য ক্রয় করবেন না। আমরা দেখতে চাই, কে কোন পর্যায়ে কত টাকা বাড়িয়েছেন।

গতকাল ৫১ টাকা কেজির চাল ৫৫ টাকা বিক্রি করায় দুটি পাইকারি চালের আড়ত সিলগালা করে দিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

গতকাল রাজধনীর পুরান ঢাকার লালবাগ কিল্লার মোড় এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে মোক্তার রাইস এজেন্সি ও হোসেন রাইস এজেন্সি নামের চালের আড়তকে জরিমানার পাশাপাশি বন্ধ করে দেয়া হয়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফাহমিনা আক্তার বলেন, করোনা ভাইরাসকে পুঁজি করে অভিনব কায়দায় ভোক্তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান দুটি জালিয়াতি করছে।

তারা ২২০০ টাকার কেনা বস্তার চাল বিক্রি করছে ২৭০০ টাকা। তাদের কোনো মূল্য তালিকা নেই। ইচ্ছা মতো দাম বেশি নিচ্ছে। এসব অপরাধে মোক্তার রাইস এজেন্সি ও হোসেন রাইস এজেন্সি দুটিকেই সিলগালা করা হয়েছে।

পাশাপাশি মোক্তার রাইস এজেন্সিকে ৫০ হাজার টাকা এবং হোসেন রাইস এজেন্সি এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তাদের অধিদপ্তরে ডাকা হয়েছে। যথাযথ তথ্য প্রমাণ ও বক্তব্য দিতে না পারলে আইন অনুযায়ী স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ