সোমবার ৩০ মার্চ ২০২০

১৬ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

ফারুক আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২২,২০২০, ০১:৪৩

মার্চ ২২,২০২০, ০১:৪৩

বিশ্ব পানি দিবস আজ

বিশ্বে বিশুদ্ধ পানির সংকট বাড়ছে

আজ ২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস। একুশ শতকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পানি সংকট মোকাবিলা। বিশ্বব্যাপী এ সংকট থেকে বাদ নেই বাংলাদেশও। পানির দেশে আজ পানির বড়ই সংকট।

বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যেই হুঁশিয়ার করে বলেছেন, খাবার পানির জন্য একুশ শতকের মাঝামাঝিতেই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ লাগবে। বিশ্বের চার ভাগের তিন ভাগজুড়ে পানি থাকলেও এক গ্লাস পানির জন্য মানুষকে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হবে। পানিই হবে শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানি নিয়ে বিশ্বযুদ্ধ হবে এক সময়। বাংলাদেশে যেখানে পানি সংকট নেই সেখানে রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব। দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় এলেও অনিরাপদ পানির কারণে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতায় স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপ বাড়ছে। ফলে নষ্ট হচ্ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। বিষয়টি গভীর উদ্বেগজনক।

দূষিত পানির সংকট মোকাবিলায় আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মানুষ যে বিকল্প উৎসের সন্ধান করবে, তারও উপায় নেই। দেশে বোতলজাত ও কনটেইনারে সরবরাহকৃত বিশুদ্ধ পানির নামে ভোক্তাদের সঙ্গে ভয়াবহ প্রতারণা করা হচ্ছে।

তাছাড়া কজন মানুষ বোতলজাত পানি কিনে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে সক্ষম, সেটাও প্রশ্ন বটে! এছাড়াও আইলার পর উপকূলীয় অঞ্চলে এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র।

দেশের রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরে পানি সংকটের পাশাপাশি রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব। পানিতে পোকা-মাকড়, দুর্গন্ধ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। রাজধানী ঢাকায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নিলেও সেগুলো কাগজে কলমেই আবদ্ধ থাকে।

প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্যে নগরীর সর্বত্র হাহাকার দেখা দেয়। পানির জন্যে শুরু হয় মিছিল সমাবেশ। আর বর্ষা মৌসুমে দেখা যায় জলাবদ্ধতা। এবছরও তার ব্যতিক্রম হবে না— এটা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

ইউনিসেফের মতে, নিরাপদ উৎস থেকে পানি সংগ্রহের সুযোগ নেই— এমন ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। দেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পসহ বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিষয়টি টের পাওয়া যায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হোসেনের মতে, পৃথিবীতে মিষ্টি জলের উৎস কমে আসছে, অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বেড়ে চলেছে।

আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক বা দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ তীব্র পানি সংকটের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পানিসম্পদের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির চক্রাবর্ত সুস্পষ্ট।

কেউ কেউ বলছেন, বিশ্বের পানি সংকটের সমাধান করতে না পারলে পানি নিয়ে বিশ্বযুদ্ধ বাধাও বিচিত্র নয়।

২০১২ সালে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, কয়েক বছরের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় পানি সংকট চরম আকারে পৌঁছাবে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এ অঞ্চলে পানিযুদ্ধের আশঙ্কা না থাকলেও আগামী ২০২২ সালের পর পানির ব্যবহার নিয়ে এই যুদ্ধ হতে পারে। উজানের দেশগুলো ভাটি অঞ্চলের দেশগুলোকে পানি-বঞ্চিত করার কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন- পবার দেয়া তথ্যমতে, দেশে (শীত ও গ্রীষ্মকালে পানি থাকে) এমন নদীর সংখ্যা ২৩০টি এবং সরকারি হিসাবে (শুধু গ্রীষ্মকালে পানি থাকে) এমন নদীর সংখ্যা ৩২০টি। অথচ দুঃখের বিষয়, এই নদীগুলোর মধ্যে বর্তমানে ১৭টি নদী তার চরিত্র সম্পূর্ণ হারিয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে গিয়ে ঠেকেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরও ২৫টি নদী দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। গবেষকদের মতে, প্রকৃতি নয়, মানবসৃষ্ট দূষণের কবলে পড়ে গত তিন যুগে প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার নদীপথ ও সুপেয় পানির উৎস বিলীন হয়েছে।

নদীতে পানি না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। রাজধানী ঢাকার চার পাশে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু— এ চারটি নদী দূষণ ও নির্মম দখলের শিকার হয়ে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ধেয়ে আসা পানি সংকট নিরসনে রাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে সমন্বিত প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।

জানা যায়, বাংলাদেশে ১২শ নদী ছিলো। বর্তমানে ছোট-বড় ২৩০টি নদীর পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। প্রায় ১৪ লাখ পুকুর-দীঘি, অসংখ্য খাল-বিল, দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর এবং উত্তরের হিমালয় ইত্যাদি এদেশকে মিঠা পানির আধার বানিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সে আধার আমরা ধরে রাখতে পারিনি আমাদের বৈরিতা আর খেয়ালিপনার কারণে।

পাশাপাশি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের নদী আগ্রাসনের শিকারও আমরা। ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশ যেটুকু পানি পাওয়ার কথা ছিলো তা তো দিচ্ছেই না বরং উজান থেকে নেমে আসা প্রায় প্রতিটি নদীতেই তারা বাঁধ দিয়ে পানি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। ভারতবান্ধব আমাদের সরকারও কিছু করছে না।

পরিবেশবিদরা বলছেন, পানি সমস্যার কবলে পড়বে পুরো বাংলাদেশ। আর সমস্যার আবর্তে বিপন্ন হবে জনগণের জীবন। বিপন্ন হবে পরিবেশ ও প্রকৃতি।

এক গবেষণায় দেখা যায়, সারা বিশ্বে ১১০ কোটি মানুষ প্রতিদিন পান করার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পায় না এবং প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার শিশু দূষিত পানি পান করে মারা যাচ্ছে।

আর বছরে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ পানিবাহিত রোগের শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে। পৃথিবীর ৮০টি দেশে পানির অপ্রতুলতার কারণে কৃষি, শিল্প এবং জনস্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন।

অথচ এদেশগুলোতে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ মানুষের বসবাস। উন্নয়নশীল দেশে খাওয়া, গোসল, রান্নাবান্না ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন গড়ে ২০ লিটার নিরাপদ পানি ব্যবহার করছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক সংবাদ হলো— উন্নত বিশ্বের একজন মানুষ প্রতিবার টয়লেট ফ্লাশওয়াশে যে পানি ব্যবহার করে উন্নয়নশীল দেশে সারাদিনেও তা ব্যবহার করার সুযোগ পায় না।

বাংলাদেশের মানুষ যে পানি পান করছে তাতে জীবনের ভয়াবহতাকে সামনে রেখে সবাই দিনাতিপাত করছে। বিশুদ্ধ পানি সংকটের কারণে বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে পানিবাহিত রোগে সংক্রমিত করছে প্রতিনিয়ত।

এ ব্যাধি থেকে বাঁচাবার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না সরকারের আচরণে। পানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের মানুষ ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করছে।

দেশের উত্তরে পানি সংকটে মরুময়তার অশনি সংকেত, দক্ষিণে ধেয়ে আসা লবণাক্ততার তীব্রতর ছোবল, ভূগর্ভস্থ পানি প্রাপ্যতার অপ্রতুলতা ও আর্সেনিক দূষণ, ভূ-উপরিস্থ পানিতে কৃষি আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল রাসায়নিক ও মনুষ্য বর্জ্য, মানুষের বসতিচাপ ও শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডে দূষণীয় পদার্থের আধিক্যে সুপেয় পানি যেন দূষণের মহাধার হয়ে পড়েছে।

এসব কারণের সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন। গ্রীষ্মকালীন অত্যাধিক তাপমাত্রা, অনাবৃষ্টি, বর্ষাকালীন অতিবৃষ্টি, শীতকালীন দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাকার কারণগুলো ভর করেছে এদেশের সুপেয় পানি সম্পদের ওপর। এসবের ভয়ানক পরিণতির শিকার হচ্ছে এদেশের মানুষ।

১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ফারাক্কার ব্যারেজ চালু হয় এবং তখন থেকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল আস্তে আস্তে মরুময়তার দিকে ধাবিত হয়। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর পশ্চিমপ্রান্তে যেখানে পদ্মা-মহানন্দা মিলিত হয়েছে সেখান থেকে রাজশাহী শহর, চারঘাট হয়ে হার্ডিঞ্জ সেতু পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় বিশাল বিশাল বালুচর।

এখন পদ্মাজুড়ে শুধু ধু-ধু বালুর চর আর চর। বড়াল, মরা বড়াল, নারদ, মুছাখান, ইছামতি, ধলাই, হুরুসাগর, চিকনাই, নাগর, গড়াই, মাথাভাঙা, ভৈরব, নবগঙ্গা, চিত্রা, বেতাগ, কালিকুমার, হরিহর, কালিগঙ্গা, কাজলা, হিসনা, সাগরখালী, চন্দনা, কপোতাক্ষ, বেলবাত ইত্যাদি নদীর অস্তিত্ব সংকটের ইতিহাস।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে ১৩টি নদীর অস্তিত্ব বিলীনের ঘোষণা দিয়েছে এবং আরও ৩০টি নদীর সংকটাপন্নতার কথা বলেছে।

যেসব নদী সংকটাপন্ন তার মধ্যে অন্যতম হলো— রায়মঙ্গল, কালিন্দি, বেতনা-কোদালিয়া, পাগলা, টাঙ্গন, কুলিক, তেঁতুলিয়া, ঘোড়ামারা, তালমা, দেওনাই, চিনাখালী, কোনী, সালদা, বিজনী, হাওড়া, সোনাই, সুতাং, খোয়াই, লংগলা, ধলাই, মনু, জুরি, সোনাইবড়দাল, নিতাই ও ভোগাই ইত্যাদি।

আমাদের দেশে মিঠা পানির একটি বড় উৎস হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি বা একুইফার। সেচকাজে মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার পানির স্তরকে দিন দিন নিচের দিকে নামিয়ে দিচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক জরিপে দেখা গেছে, ১৯৭৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২০-২৫ ফুট পানির স্তর নিচে নেমে গেছে কুষ্টিয়া জেলায়। এটি শুধু ঢাকা কিংবা কুষ্টিয়াই নয়, সারা দেশেই কম-বেশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার টেনডেনসি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ফলে আর্সেনিক বিষের ভয়াবহতা দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। খুলনা অঞ্চলে ১৯৭৫-৯২ সময়কালে শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততার পরিমাণ ফারাক্কা বাঁধ পূর্ববর্তী মাত্রার চেয়ে ১৮০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাগরের লোণাপানি দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল ছাড়িয়ে ২৮০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে গেছে।

বর্তমানে দেশে ১৯ জেলা কমবেশি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। সিডর-আইলার পর উপকূলে লবণাক্ততার মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা যেন এখন চিরাচরিত দৃশ্য।

এ জলাবদ্ধতা তিন-চার দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরাসহ হরেক ধরনের রোগবালাই ছড়ায়। জলাবদ্ধতা মোকাবিলার জন্য প্রতি বছরই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু সেগুলোর কখনো বাস্তবায়ন হতে দেখেনি দেশবাসী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশ্লিষ্টদের এসব প্ল্যান শুধুই আইওয়াশ মাত্র। রাজধানীসহ দেশের নদীগুলো সচল রাখতে যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পানির অপব্যবহার ও অপচয় রোধ করার জন্য জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ