শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০

২০ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

নূর মোহাম্মদ মিঠু

প্রিন্ট সংস্করণ

জুন ৩০,২০২০, ০৯:১৬

জুন ৩০,২০২০, ০৯:১৬

ঘাটে এসেই ঘটলো সলিল সমাধি

যেখানে লাশ শব্দটি শুনেই শরীর যেনো শিউরে ওঠে, সেখানে একে একে চোখের সামনে বুড়িগঙ্গার তলদেশ থেকে গতকাল উঠিয়ে আনা হয় নারী-শিশুসহ ৩৬ তরতাজা লাশ। লাশের জন্য বুড়িগঙ্গার ঘাটে অপেক্ষমাণ স্বজনের কেউ লাশ পেয়ে কাঁদছেন আবার কেউ না পেয়ে কাঁদছেন। এমন পরিস্থিতিতে বুড়িগঙ্গার দুপাড়ের আকাশ-বাতাস যেনো ভারী হয়ে ওঠে।

গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গার ফরাশগঞ্জ ঘাট এলাকায় দুই লঞ্চের একটির ধাক্কায় সূত্রপাত হয় ১৩ সেকেন্ড স্থায়ী এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার। যে দুর্ঘটনায় গতকাল ডুবে যাওয়া লঞ্চটিতে থাকা অর্ধশত পরিবারে জুড়ে বসেছে আজীবনের কান্না। যে কান্না থামানোর সুযোগ নেই আর কিছুতেই।

জানা গেছে, চাঁদপুর থেকে আসা ময়ূর-২ লঞ্চ সদরঘাটে নোঙ্গর করতে গিয়ে মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মর্নিং বার্ড নামের অপর লঞ্চকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলেই এটি ডুবে যায়। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে দেখা যায়, ১৩ সেকেন্ড স্থায়ী হয় এ ঘটনা।

এরপর থেকেই ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, বিআইডব্লিউটিএসহ বিভিন্ন সংস্থার উদ্ধারকর্মীরা একের পর এক উঠিয়ে আনেন ৩৬টি তাজা লাশ। তাদের মধ্যে শেষ খবর পর্যন্ত ৩০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানা গেছে। বাকিদের উদ্ধারে অভিযান চলছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত লঞ্চডুবির এ ঘটনাকে আপাতদৃষ্টিতে পরিকল্পিত বলে বলেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।

বিআইডব্লিউটিএ-এর পরিবহন পরিদর্শক মো. সেলিম জানান, এমভি মর্নিং বার্ড লঞ্চটি মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের দিকে আসছিল। শ্যামবাজারের কাছে নদীতে চাঁদপুর থেকে আসা ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় সেটি ডুবে যায়। ওই লঞ্চে অর্ধশতাধিক যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন। তবে ঠিক কতজন এখনো নিখোঁজ, তা স্পষ্ট নয়।

উদ্ধারকাজে অংশ নেয়া ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা জানান, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার কাছাকাছি এলাকায় নদীর মাঝখানে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি শনাক্ত করা হয়েছে। ভেতরে আর কারো লাশ আছে কি না, তা তল্লাশি করে দেখা হচ্ছে।

তল্লাশি শেষে বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী নৌযান ডুবে যাওয়া লঞ্চটি টেনে তুলে সরিয়ে নেবে। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার পর থেকে ডুবুরি দল কাজ শুরু করার পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএর কর্মীরাও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয় বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা রোজিনা ইসলাম।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চাঁদপুর থেকে আসা ময়ূর-২ ভোর সাড়ে ৪টার দিকে লালকুঠীঘাটে যাত্রী নামিয়ে সদরঘাটের চাঁদপুরঘাটে গিয়ে নোঙ্গর করার জন্য ব্যাক গিয়ারে ঘুরছিল। ওই সময় পেছনে নদীতে থাকা এমভি মর্নিং বার্ডের সঙ্গে ধাক্কা লাগে।

দুর্ঘটনার পর হাজার হাজার মানুষ ঘাটে এসে ভিড় করে। মর্নিং বার্ডের নিখোঁজ যাত্রীদের খোঁজে ঘাটে আসা স্বাজনদের বিলাপ করতে দেখ যায়। ঘটনার পর যমুনা ব্যাংকের ইসলামপুর শাখার কর্মচারী সুমন তালুকদারকে শনাক্ত করেন তার বড় ভাই নয়ন তালুকদার।

তিনি জানান, তাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমে। প্রতিদিন বাড়ি থেকে এসে পুরান ঢাকার ইসলামপুরে অফিস করতেন সুমন।
প্রতিদিনের মতো সকাল সাড়ে ৭টার দিকে লঞ্চে উঠে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন এক সন্তানের বাবা সুমন। পরে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এবং তার ফোন বন্ধ পেয়ে সদরঘাটে ছুটে আসেন তার ভাই।

এরকম আরও অনেকের স্বজনরা মিটফোর্ড হাসপাতালে এবং সদরঘাটে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং স্বজনদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করে কথা বলছেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক বলেন, দুই লঞ্চের কর্মীদের অসতর্কতায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে তারা মনে করছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে দেবেন বলে জানিয়েছেন।

এছাড়া দশ হাজার টাকা করে দেয়া হবে দাফনের জন্য। আর ঘটনা তদন্তে গঠন করা হয়েছে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি, যারা সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবেন।

এছাড়া জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ২০ হাজার টাকা এবং বিআইডব্লিউটিএ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নিহতদের পরিবারকে দেয়া হয়েছে গতকাল।

মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম উপজেলার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর। বঙ্গবাজারে কাপড়ের ব্যবসা করেন। প্রতিদিনের মতো গতকাল সকাল পৌনে ৮টায় তিনি মর্নিং বার্ড লঞ্চে করে ঢাকার পথে রওনা করেন। তার সঙ্গে ছিলেন মীরকাদিম পৌর এলাকার প্রায় ১০ জন যাত্রী। কথা আর আড্ডা দিয়ে তারা লঞ্চের ভেতরে সময় কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয় ময়ূর-২ নামের লঞ্চ।

একপাশে কাত হয়ে যায় মর্নিং বার্ড। সবাই লঞ্চ থেকে ছিটকে নদীতে পড়তে থাকে। তিনিও পানিতে পড়ে যান। তার গায়ের ওপর পড়েন ১০-১২ জন যাত্রী। চোখের সামনেই অনেকে পানিতে তলিয়ে যান। তিনিও ডুবতে ডুবতে ভেসে ওঠেন। কোনো রকম সাতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন তিনি।

তার ভাষায়— ৫ মিনিট আগেও যাদের প্রাণবন্ত আড্ডা চলছিল, তারাই চোখের সামনে ডুবে হারিয়ে গেলেন। এটা যে কতটা কষ্টের, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা নাজমা আক্তার, জুমকি, কাকলি বেগম ও মমিন আলীও ছাড়াও বেঁচে ফেরা অনেকেই একই ধরনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

এদিকে ঘাতক ময়ূর-২ লঞ্চটি জব্দ করা গেলেও চালক পলাতক রয়েছে।

আমারসংবাদ/এআই