বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০

৫ কার্তিক ১৪২৭

ই-পেপার

মুহাজিরুল ইসলাম রাহাত, সিলেট

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ২৫,২০২০, ১২:৪৩

সেপ্টেম্বর ২৫,২০২০, ১২:৪৩

সিলেট আওয়ামী লীগে অসন্তোষ

কেন্দ্রের নির্দেশনার পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে নড়েচড়ে বসে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ। শুরু হয়েছে তোড়জোড়। চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। কেন্দ্রের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যেই গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রস্তাবিত কমিটি জমা দেন সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এখন পূর্ণাঙ্গ দুটি কমিটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

কেন্দ্রীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে এই কমিটি অনুমোদন দেয়া হতে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে সিলেটের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রস্তাবিত কমিটিতে ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ ঝাড়ছেন বঞ্চিত নেতাদের কর্মী-সমর্থকরা।কাঙ্ক্ষিত পদ পেতে অনেক নেতা এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন।

অন্যদিকে আসন্ন দুটি পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়া ও বাদ পড়া নিয়ে স্থানীয় একাংশের নেতারা কেন্দ্রে লিখিত অভিযোগও দাখিল করেছেন।

মহানগর কমিটিতে যারা আসছেন : দলীয় সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত কমিটিতে মহানগরে বর্তমান সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদের ভাই আসাদ উদ্দিন আহমদকে সিনিয়র সহ-সভাপতি রাখা হয়েছে।

তিনি বিগত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সহ-সভাপতি পদে ফয়জুল আলওয়ার আলাওর, অ্যাডভোকেট রাজ উদ্দিন, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক বিজিৎ চৌধুরী, সাবেক সহ-সভাপতি আবদুল খালিক, হেলাল বক্সসহ ১১ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম যুগ্ম সম্পাদক পদে সাবেক কমিটির সদস্য আজম খানের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

অন্যদের মধ্যে এই পদে সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এটিএম হাসান জেবুল ও প্রচার সম্পাদক আবদুর রহমান জামিলের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। সাংগঠনিক সম্পাদক পদে বিগত কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ, সাবেক উপদপ্তর সম্পাদক বিধান কুমার সাহা, সাবেক সদস্য ও কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট সালেহ আহমদ সেলিমকে রাখা হয়েছে।

এছাড়া কাউন্সিলর ইলিয়াস আহমদকে সম্পাদকীয় পদে, রজত কান্তি গুপ্তকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং কাউন্সিলর তৌফিক বক্স লিপনকে সম্পাদকীয় পদে রাখা হয়েছে। দপ্তর সম্পাদক পদে সাবেক কমিটির উপপ্রচার সম্পাদক গোলাম সুবহান চৌধুরী দিপন এবং প্রচার সম্পাদক হিসেবে অ্যাডভোকেট জুনেল আহমদকে রাখা হয়েছে।

সদস্য পদে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন, তার স্ত্রী সেলিনা মোমেন ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জুয়েলের নামও প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রাহাত তরফদার, মহানগর যুবলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুদীপ দেব, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমরুল হাসান, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল বাছিত রুম্মান ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীম তুষারের নাম সদস্য পদে প্রস্তাব করা হয়েছে।

যারা বাদ পড়েছেন : সূত্র আরও জানায়, মহানগরে বিগত কমিটির অন্তত এক ডজন নেতাকে ‘মাইনাস’ করা হয়েছে। এদের মধ্যে বিগত কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি সিরাজ বকস্, সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট তুহিন কুমার দাস ও মোশাররফ হোসেন, আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কিশোর কুমার কর, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক তপন মিত্র, বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক জগদীশ চন্দ্র দাস, দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামসুল ইসলাম, শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক দিবাকর কুমার ধর, সদস্য জামাল আহমদ চৌধুরী ও ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলামসহ অনেকে বাদ পড়েছেন।

আবার কেউ কেউ উপদেষ্টা পরিষদে জায়গা পেয়েছেন। এদিকে মহানগরের তুলনায় অবশ্য জেলা কমিটিতে বাদ পড়েছেন কম সংখ্যক নেতা। তবে প্রস্তাবিত কমিটিতে যোগ্যতা অনুসারে পদ-পদবি দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ অনেকের। এছাড়া বিতর্কিত নেতাদের এই কমিটিতে নাম প্রস্তাব করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠেছে।

অন্যদিকে জেলায় সিনিয়র সহ-সভাপতি পদ নিয়ে দুই চৌধুরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। তারা হলেন— বিগত কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী ও সিলেট-৩ আসনের এমপি সাবেক সহ-সভাপতি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী। তারা উভয়ই সম্মেলনে সভাপতি পদপ্রত্যাশী ছিলেন। ফলে তাদের উভয়েরই নাম সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে প্রস্তাব করা হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, এই পদে কে আসবেন সেটি সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্র। ফলে এ পদ বাগিয়ে নিতে মরিয়া শফিক ও সামাদ। দুজনই কেন্দ্রে লবিয়িং-তদবির চালাচ্ছেন।

জেলায় যারা আসছেন : দলীয় সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত কমিটিতে সহ-সভাপতি পদে ড. তৌফিক, যুবলীগ নেতা ড. আহমদ আল কবির, শাহ ফরিদ, অ্যাডভোকেট শাহ মুশাহিদ, অ্যাডভোকেট নিজাম উদ্দিন, সুজাত আলী রফিক, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদসহ ১২-১৩ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

যুগ্ম সম্পাদক পদে সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ূন ইসলাম কামাল, মোহাম্মদ আলী দুলাল ও সাবেক শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক কবির উদ্দিন আহমদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সাবেক প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহফুজ আহমেদ, সাবেক দপ্তর সম্পাদক সাইফুল আলম রুহেল এবং সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকারের নাম রয়েছে।

দপ্তর সম্পাদক পদে সাবেক উপদপ্তর সম্পাদক জগলু চৌধুরী, প্রচার সম্পাদক পদে আব্বাস উদ্দিনের নাম রয়েছে এবং সংস্কৃতিকর্মী শামসুল আলম সেলিমকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে রাখা হয়েছে।

এছাড়া সম্পাদকীয় পদে অ্যাডভোকেট আজমল আলী, মোস্তাক আহমদ পলাশ, মজির উদ্দিন, জেলা পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান মতিকে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে সিলেটের শিক্ষাঙ্গনে প্রভাব বিস্তারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া উপদপ্তর সম্পাদক পদে প্রস্তাবকৃত মজির উদ্দিনের বাবা ছত্তার মেম্বার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ছিলেন। এছাড়া অ্যাডভোকেট আজমল আলী, মোস্তাক আহমদ পলাশের বিরুদ্ধে নিজ দলীয় নেতাদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা জানিয়েছেন, তারা বালু ও পাথর ব্যবসায় বিতর্কিত। পাশাপাশি হত্যামামলারও আসামি হয়েছেন কেউ কেউ। আর উপপ্রচার সম্পাদক পদে মতিউর রহমান মতি বঙ্গবন্ধুর খুনি পরিবারের সদস্য বলে নেতারা জানিয়েছেন।

সদস্য পদে জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান লোকমান উদ্দিন চৌধুরী, বিশ্বনাথ উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম নুনু মিয়া, জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কালাম আহমদ, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান আবু জাহিদ, লেবু চেয়ারম্যান, কানাডা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সারওয়ার আহমদ, বারিসহ অনেকের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

অন্যদিকে উপদেষ্টা পরিষদে রাখা হয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ আবু নছর, প্রয়াত মেয়র কামরানের স্ত্রী আছমা কামরান, অধ্যক্ষ সামসুল ইসলামসহ অনেককে।

যারা বাদ পড়েছেন : জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি থেকে এবার বাদ পড়ছেন বিগত কমিটির সহ-সভাপতি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক অ্যাডভোকেট শেখ মখলু, অ্যাডভোকেট ময়নুল হক, অধ্যক্ষ শামসুল হকসহ কয়েকজন নেতা। এদের কেউ কেউ আবার উপদেষ্টা পরিষদে জায়গা পেয়েছেন।

২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণার মাধ্যমে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।

এতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক হন অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান। এদিকে মহানগর সভাপতি নির্বাচিত হন মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ। আর সাধারণ সম্পাদক হন অধ্যাপক জাকির হোসেন।

আমারসংবাদ/এআই