মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০

১২ কার্তিক ১৪২৭

ই-পেপার

জাহাঙ্গীর আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

অক্টোবর ১৮,২০২০, ০১:০১

অক্টোবর ১৮,২০২০, ০৪:৫৮

দেশেই বিশ্বমানের সিরামিক পণ্য

একসময় ঘর সাজাতে, বাড়ি তৈরিতে ও অতিথি আপ্যায়নে বিদেশ থেকে সিরামিকের পণ্য আনা হলেও হাঁটি হাঁটি পা পা করে দেশেই বিশ্বমানের সিরামিক তৈরি হচ্ছে। শুধু দেশের চাহিদাই মেটাচ্ছে না, রপ্তানি করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

এ খাতে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ লাখেরও বেশি দক্ষ লোকবল কাজ করছেন। অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। অপার সম্ভাবনা রয়েছে এ শিল্পের। আরও দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে তা কাজে লাগাতে পারলে কমবে আমদানি, বাড়বে রিজার্ভ।

সম্প্রতি এ খাতের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার আলোকে আলাপচারিতায় এ প্রতিবেদকের কাছে এমনই তথ্য তুলে ধরেন পা-ওয়াং সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মাহবুব আলম।  
 
উচ্চবিত্তের খাবার টেবিলে টেবিলওয়্যার হিসেবে সৌখিনতার জন্য এ দেশের মানুষ সিরামিক পণ্যের ব্যবহার শুরু করে বহু বছর আগে। ’২০ শতকের শেষ দিকেও আমদানি এবং দেশের অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ সৌখিন পণ্যের যোগান দিতো।

তবে গত এক দশকে দেশে সিরামিক পণ্যের বাজারে এসেছে বড় পরিবর্তন। একটি বৃহৎ শিল্পে রূপ নিয়েছে বাংলাদেশের সিরামিক খাত। দেশে গড়ে উঠেছে ৬৮টি সিরামিক ফ্যাক্টরি।

সিরামিক শিল্পের অতীত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এস এম মাহবুব আলম বলেন, এক সময়ে অভিজাত মানুষের চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে সিরামিক পণ্য আমদানি করা হতো। পাকিস্তান আমলে মিরপুরে ১৯৫৮ সালে প্রথম দেশে সিরামিক কারখানা গড়ে উঠে। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার কারণে তা বিকশিত হতে পারেনি।

তবে আশির দশকের পর টেবিল সিরামিকে পিপলস, মন্নু সিরামিক, সাইনপুকুর আসার পরে স্থানীয় বাজার শুরু হয়। প্রথমে তাদের অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত এভাবে বিভিন্ন সমস্যায় শিরামিককে চলতে হয়েছে।  
 
মানুষের জীবনযাত্রার মানোউন্নয়নে বিলাসী মনোভাব গড়ে উঠেছে। তাই জীবনকে সাজাতে বিশেষ করে বাড়ি তৈরি ও সংসার সাজাতে ৮৫ শতাংশ সিরামিক আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটায়। এরপর খুব অল্প সময়েই দেশে টেকনোলজির উদ্ভাবনের ফলে ভালোমানের সিরামিক পণ্যও তৈরি হতে থাকে। বিশেষ করে টাইলস পণ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে।

র ম্যাটেরিয়াল (কাঁচামাল) থেকে শুরু করে ফিনিশড পণ্যের কোথাও হাত দিতে হয় না। অটোমেটিকভাবে টাইলস তৈরি হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তির সব কিছু আমাদের কাছে পৌছে গেছে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দুই ফুট বাই দুই ফুট টাইলস আমরা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। এটা স্টান্ডার্ড পর্যায়ের। ভালোমানের ম্যাটেরিয়াল দিয়েই তৈরি করা হচ্ছে। পুরুত্ব (থিকনেস) ভালোভাবে দেয়ায় তা সহজে ভাঙে না। ম্যানুফেকচারিং টেকনোলজির কারণেই তা সম্ভব হয়েছে।

দেশের সিরামিক খাতে বিশেষ করে বেকারত্ব দূর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, আমদানি নির্ভরতা কমানো তথা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে আমাদের প্রতিষ্ঠানটি। পা-ওয়াংয়ের রোমা টাইলস এখন বেশ জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ডের এ টাইলস সৃষ্টিশীলতা, আধুনিকতা এবং রুচি ও আভিজাত্যের প্রতীক।

বাংলাদেশে সিরামিকের বাজার সাইজ কত— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অল্প সময়ে এটার বিকাশ ঘটেছে। ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকটিক্যাল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এর ফলে বাংলাদেশের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি ধীরে ধীরে ভালো অবস্থানের দিকে এগুচ্ছে। সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির বেশ কয়েকটি সাবসেক্টর রয়েছে।

এগুলো হলো— বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালসের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি (টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার), টেবিল ওয়্যারের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি, অ্যাডভান্স সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি। বিল্ডিং ম্যাটারিয়ালস বলতে ফ্লোর বা ওয়াল টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার।

টেবিলওয়্যার সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি বলতে থালা-বাসন, কাপ-পিরিচ, ডাইনিংয়ে ব্যবহারযোগ্য সিরামিক পণ্য। আর অ্যাডভান্স সিরামিকের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশনের পার্টস থেকে কৃত্রিম দাঁতসহ স্পেস ক্রাফটের মতো কিছু স্পর্শকাতর যন্ত্রাংশ।

মাহবুব আলম বলেন, সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির মার্কেট সাইজ সারা বিশ্বের হিসাবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে এক শতাংশ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কেট শেয়ার রয়েছে চীনের, প্রায় ৭০ শতাংশ। বিশ্ব বাজারে-এরই অবস্থানে রয়েছে ইতালি। বর্তমানে দেশে বেশি করে নগরায়নের ফলে টাইলসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

অপরদিকে আভিজাত্যের খোরাক মেটাতে টেবিলওয়্যার টাইলসেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এর বাজার সম্প্রসারণে বাধা কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, র ম্যাটেরিয়ালের পরিবহন ব্যয় খুবই বেশি। বেশি খরচের কারণে বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকা মুশকিল।

তারপরও বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে দেশি সিরামিক শিল্প। ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার, আরও বেশি করে দক্ষ লোকবল নিয়োগ করে এই সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।

সিরামিক পণ্য রপ্তানির প্রধান বাধাগুলো চিহ্নিত করে মাহবুব আলম বলেন, ‘এক্ষেত্রে অন্য দেশের তুলনায় আমরা এখনো পিছিয়ে রয়েছি। অন্য দেশের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটি পৌঁছে দিতে আমাদের খরচ অনেক বেশি হয়। কাঁচামাল আমদানিতে ৩২ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়।
বিদেশে সরাসরি ও দ্রুত পণ্য পৌঁছানোর যথাযথ কোনো ব্যবস্থা নেই।

এ মুহূর্তে সিরামিক পণ্যে সবমিলে ৩৮ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ বড় বাধা উল্লেখ করে তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরুন ১০০ টাকার পণ্যে ৩৮ টাকা সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয়। বাকি ৬২ টাকার মধ্যে রয়েছে কাঁচামাল, লোকজনের বেতন, কারখানার খরচ। তারপর লাভের হিসাব। এভাবে বেশি ট্যাক্সের কারণে টেকা মুসকিল। তাই ২০ শতাংশ ট্যাক কমানো দরকার বলে জানান তিনি।

পা-ওয়াং সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির ব্যাপারে জানতে চাইলে দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথমে একটু কম করে উৎপাদন করা হচ্ছে। চীনে করোনা সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দেশের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিতে তার প্রভাব পড়েছে।

কারণ, আমরা বিদেশ থেকে অনেক কাঁচামাল আমদানি করে থাকি। অন্যান্য শিল্পের মতো সিরামিক শিল্পের উৎপাদনও এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ ছিলো। কেউ কেউ তিন মাস পরই অপারেশন শুরু করে দিয়েছে। তবে সরকার ছুটি তুলে নিলে আবার কারখানা চালু করা হয়েছে।

উত্তরবঙ্গে ব্যাপকভাবে শিল্পায়ন হচ্ছে। প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সার্বিক দিক বিবেচনা করে উত্তরবঙ্গের বগুড়ায় ১৭ বিঘা জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে পা-ওয়াং ইন্ডাস্ট্রি। গুণগত মানের দিক থেকে আমাদের সিরামিক পণ্য দেশের বাইরের পণ্যের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।

স্যানিটারি পণ্য বিশেষ করে টাইলসে আমাদের কোয়ালিটি বিশ্বমানের। পা-ওয়াং সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি রোমা ব্রান্ড-এর লাক্সারিয়াস টাইলস উৎপাদন করে। বিদেশ থেকে যে পণ্যগুলো দেশে আসছে আমরা ঠিক সেই মানের পণ্য উৎপাদন করি। ওয়াটার ট্রিটমেন্টসহ আধুনিক সব প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে এখানে।

তাই বিশ্বমানের লাক্সারি সিরামিক পণ্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। দেশের অন্যান্য কোম্পানির সিরামিক পণ্য ইউরোপের ইটালী, ফ্রান্স, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। অল্প সময়ে আমাদের সিরামিক পণ্য ভারতে রপ্তানি শুরু হবে বলে জানান তিনি।        

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম সিরামিক কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৮ সালে। নাম ছিলো তাজমা সিরামিক। তাজমার উৎপাদন খুব সীমিত ছিলো। ১৯৬৬ সালে যাত্রা শুরু করে পাকিস্তান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে নাম পাল্টে পিপলস সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ হয়।

দেশের স্বাধীনতার পর সিরামিক খাতে ১৯৭৪ সালে ঢাকা সিরামিক ও স্যানিটারিওয়্যার যাত্রা শুরু করে। তারাই দেশে প্রথমবারের মতো স্যানিটারিওয়্যার উৎপাদন শুরু করে। বাংলাদেশি সিরামিক পণ্যের মূল রপ্তানি বাজার ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্য। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সিরামিক খাতে রপ্তানি আয় হয়েছে ছয় কোটি ৯০ লাখ ডলার।  যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৮৭ কোটি টাকা।

আমারসংবাদ/এসটিএম