বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০

২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ২৫,২০২০, ০১:১৬

ফেব্রুয়ারি ২৫,২০২০, ০১:১৭

বাংলা ভাষার ব্যবহার ও মর্যাদা রক্ষা প্রয়োজন বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন

১৯৫২ সালের অমর একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নেমেছিলো বাংলার দামাল ছেলেরা। প্রাণ দিয়েছিলেন রফিক, সফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ আরও অনেকে। তাদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলা ভাষা।

মাতৃভাষার জন্যে এমন সাহসী মহান আত্মত্যাগ আজ সারা বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বাঙালি জাতি গৌরবের মহিমা নিয়ে বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

একটি দেশের জন্যে, একটি জাতির জন্যে আর একটি ভাষার জন্যে এমন সাফল্য ও মর্যাদার আর কিছু আছে বলে আমাদের জানা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— যে ভাষার জন্যে এতো আত্মত্যাগ, বিশ্বব্যাপী এতো সম্মাননা সে ভাষার অবস্থান এদেশে এখন কোথায় ?

দেশের জন্যে দেশের মানুষের জন্যে সে ভাষার ব্যবহার কত ভাগ নিশ্চিত হয়েছে ? বিদেশি ভাষার রোষাণলে পড়ে সে ভাষা আজ কতখানি লাঞ্ছিত ? কতটা বঞ্চিত হয়ে আছে এ ভাষার জন্যে প্রাণ বিসর্জন, এতো ত্যাগ, এতো তিতীক্ষা? জানি এ প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব কেউ দিতে পারবে না। কারণ বাংলাদেশের কর্তৃত্বস্থানীয় অবস্থায় যারা আছেন সেটা সরকারের ভেতরে কিংবা বাইরে, তাদের কারো জানার কথা নয়।

দেশের অধিকাংশ রাজনীতিকরা এমন হয়ে গেছেন— যেখানে নিজের অবস্থান বিনির্মাণ আর অর্থ বানানোর ফন্দি-ফিকির ছাড়া অন্য কিছু ভাবেন না তারা। অথচ সেই সকল কর্তৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি প্রতিনিয়তই বলে থাকেন জন সেবার কথা, দেশের উন্নয়নের কথা।

সে সব শুধু লোক দেখানো কথার কথা মাত্র। রাজনীতির ব্যানারে থেকে আত্মনীতির মন্ত্রটুকু এ দেশের রাজনীতিকগণ বেশ ভালোই বোঝেন। কাজেই দেশের জন্যে, দেশের ভাষার জন্যে কবে- কে কোথায় প্রাণ দিয়েছিলো সে কথা ভাবার অবকাশ তাদের নেই।

১৯৯৯ সাল থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের উদ্দেশ্য স্ব-স্ব জাতির মাতৃভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন, ভালোবাসা জাগিয়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের দায়িত্ব অনেক।

কারণ বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতেই এদের কোটি কোটি মানুষের মায়ের ভাষা বাংলার জন্যে আন্দোলন করে শহীদ হোন এদেশেরই সাহসী সন্তানরা। তা নাহলে বাংলা ভাষায় কথা বলার সাধ্য কারো ছিলো না।

ভাষার অভিধানে হয়তো বাংলা নামের কোনো ভাষা থাকতো কি-না সে বিষয়ে সন্দেহ ছিলো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এদেশেই বাংলা ভাষার সর্বস্তরে ব্যবহার এখনো নিশ্চিত হয়নি। যে ভাষার জন্যে এতো আত্মত্যাগ সেই বাংলা ভাষাই আজ এদেশে অবহেলিত।

বিষয়টি সত্যি দুঃখজনক। এদেশের সরকারের ভেতরের কিংবা বাইরের কর্তৃত্বস্থানীয় অধিকাংশ ব্যক্তি দারুণ ভাবে সুবিধাভোগী। বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করে আজ তারা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছেন। অঢেল অর্থ খরচ করে তারা তাদের ছেলে মেয়েদেরকে বেসরকারি ইংলিশ মাধ্যম স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়াচ্ছেন।

যদিও সাধারণ দরিদ্র ঘরের ছেলে মেয়েরা দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়াশোনা করছে, কিন্তু কর্তৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের নোংরা রাজনীতির কারণে ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে সে সকল সাধারণ ছাত্র ছাত্রী। অন্যদিকে দেশীয় আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছেনা। আদালতের জন্যে কিছু পরিভাষার প্রয়োজন রয়েছে সে কথা সত্যি; কিন্তু তার মানে এই নয় যে, মাতৃভাষা থাকবে না, মাতৃ ভাষার ব্যবহার হবে না।

দেশের বহু আইনবিদ এখনো পশ্চাৎপদ চিন্তা ধারাকে লালন করছেন। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলার ব্যবহার নাম মাত্র হয়ে থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে কার্যক্রম বাস্তবায়নের সকল স্তরে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে আসছে। জাতীয় দৈনিকগুলোতেও তারা বিজ্ঞাপন, প্রজ্ঞাপন জারি করছে ইংরেজিতে।

এদেশে সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় বা করে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এদেশে এখন একেবারেই নগণ্য। দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদিত পণ্যের বিজ্ঞাপন ও মোড়কে ইংরেজি ভাষা প্রয়োগ করে তারা বোঝাতে চেষ্টা করে তাদের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী বিদেশি অর্থাৎ বিশ্বমানের। ইলেকট্রনিকের দোকানে বা শো-রুমের কোনো পণ্যের গায়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। প্রতিটি পণ্যের মোড়ক ও পণ্যের গায়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার নেই বললেই চলে।

প্রতিটি পণ্যের গায়ে ও মোড়কে ইংরেজি, কিছুটা চাইনিজ লেখা সচরাচর চোখে পড়ে। একইভাবে দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একই অবস্থা। প্যাকেট বা মোড়কে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার আজ সাধারণ বাঙালিদের বিস্মিত করে তুলেছে।

এ দেশের মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর চিত্রও একই। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর সকল কার্যক্রম ও গ্রাহক সেবার সকল স্তরেই ইংরেজি ভাষার ব্যাপক ব্যবহার দেশবাসীকে আজ ভাবিয়ে তুলেছে।

অন্যদিকে প্রসাধনী সামগ্রী থেকে শুরু করে সকল সামগ্রীতে আজকাল বাংলা ব্যবহারের প্রচলন দিনকে দিন কমছেই। ইংরেজি ভাষা খুব দ্রুত ওঠে আসছে এদেশের সকল স্তরে, সকল কাজে এবং পরিবেশে।

সরকারি কিংবা বে-সরকারি অফিস, আদালত, ব্যবসা বাণিজ্য, পণ্যের উৎপাদন, মোড়ক, বাজারজাতকরণ ও প্রচারে বাংলা ভাষা ব্যবহার করলে কী ধরণের ক্ষতি বা নীচুতা চলে আসে দেশের সাধারণ মানুষ তা বুঝে উঠতে পাচ্ছে না। বাংলা ভাষা যদি এতোই অবহেলিত হয় তবে বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষার এতো কদর, সম্মান, প্রিয়তা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন?

যারা বাংলা ভাষাকে সাধারণ মানুষের ভাষা, সাধারণ মানুষের সাথে চলাফেরা মেলা মেশার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন এবং বিদেশি ভাষাকে সিঁড়ি বানিয়ে সম্মানিত হতে চান তাদের ভাবা উচিত— এদেশ বাংলাদেশ, বাংলা ভাষার দেশ। দেশের জন্যে, দেশের মানুষের জন্যে অনেক ত্যাগ হয়েছে, অনেক রক্ত ঝরেছে। গুটি কতক মানুষের অহেতুক সৌখিনতা আর বাড়া-বাড়ির কারণে তা বিফলে যেতে পারে না।

অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা কোনো ক্রমেই লাঞ্ছিত হতে পারে না। কোনো কারণে বাংলা ভাষার অবমূল্যায়ণ বা অমর্যাদা বরদাস্ত করবে না এদেশের সাধারণ মানুষ। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করেই যদি ভাষা ও ভাষা শহীদদের পূর্ণ মর্যাদা দেয়া যায় তবে বিশ্ববাসী এ জাতিকে গবেট মূর্খ জাতি বলে আখ্যা দেবে।

বাংলা ভাষা ও ভাষা শহীদদের পূর্ণ মর্যাদা দিতে হলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অফিস আদালত, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পণ্যের উৎপাদন, মোড়ক ও বাজারজাত করণের সকল স্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করণে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

একুশে ফেব্রুয়ারি বা “বায়ান্ন” শব্দ দু’টির মাহাত্ম্য বাস্তব ক্ষেত্রে প্রতিফলিত করতে হবে। শুধু ঢাকঢোল পিটিয়ে, কালোব্যাজ ধরণ করে, মাইকে দেশের গান বাজিয়ে শহীদদের স্মরণে ফুল দেয়াকে ভাষার প্রতি, ভাষা শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখানো বলে না।

বরং ইংরেজিসহ অন্যান্য বিদেশি ভাষাগুলোর দৌরাত্ব্যে বাংলা আজ যেহারে নিগৃহীত হচ্ছে— তাকে রোধনা করা হলে একুশে ফেব্রুয়ারি বা বায়ান্ন শব্দ দু’টি শুধু পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহারের জন্যে সরকার কিংবা সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড রকমের একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

কারণ জাতি হিসেবে বাঙালিরা সাহসী ও আত্মত্যাগী। ভাষার জন্যে, ভাষা শহীদদের ত্যাগের মাহাত্ম্যের জন্যে এটুকু আমরা অবশ্যই করবো— এ বিশ্বাস এখন শুধু এদেশের সাধারণ বাঙালিদের নয়। এ বিশ্বাস এখন গোটা বিশ্ববাঙালির।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আমারসংবাদ/এসটিএমএ