বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০

১৭ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

এ কে এম এ হামিদ

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ১৫,২০২০, ০৪:৪৩

সেপ্টেম্বর ১৫,২০২০, ০৪:৪৫

কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক মন্দা উত্তরণ ও সমৃদ্ধি অর্জনে প্রযুক্তিই হবে মূল ভিত্তি

কোভিড-১৯-এর প্রভাবে বিশ্ব আজ অবরুদ্ধ। এ ভাইরাস বিশ্বব্যাপী শুধু জীবনহরণ করছে না, জীবিকা বিনাশেও ভয়ানক ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ধারণা করছে কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব রোধে দেশে দেশে লকডাউনের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এ বছর ৩ শতাংশ সংকুচিত হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বলা হয়েছে— বিশ্বে ১০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে বৈশ্বিক মহামন্দার।

এ মহামন্দা ১৯২০ সালের মহামন্দার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নয়নশীল সকল দেশের সরকার প্রধানদের মাঝে দুশ্চিন্তার কালো ছাপ স্পষ্ট। এটা যতটা কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুহার ঊর্ধ্বমুখীর জন্য, ঠিক ততটাই অর্থনীতিতে মহামন্দার আশঙ্কাজনিত। এ পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি এই মন্দা পরিস্থিতি থেকে কিভাবে বের হয়ে আসবে সেটাই এখন ভাবনার বিষয়।

 এই যে দেশে দেশে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেই মন্দার সংজ্ঞাটা আসলে কী? যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ বলছে— মন্দা হচ্ছে যখন সর্বক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায় এবং সেটা কয়েক মাসের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়। সাধারণত এটা প্রকৃত জিডিপি, প্রকৃত আয়, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রির মধ্যে প্রতিফলিত হয়।

কোভিড-১৯-এর কারণে যদি লকডাউনের মতো বিধিনিষেধ দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকে, তাহলে অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। ফলে মন্দা আরো অনেক বেশি গভীর হবে এবং তা থেকে বেরিয়ে আসতে অনেক সময় লাগবে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ এবং সমাজতত্ত্ববিদ এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব-নিকাশের চেয়ে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য করোনা মোকাবিলায় বেশি জোর দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামি দুই-তিন মাসের মধ্যে করোনা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে দুই-এক বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবুও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ সরকারও এক লাখ তিন হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

 প্যাকেজের আওতায় রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ তহবিল, কৃষি ভর্তুকি, বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, গৃহহীন মানুষের জন্য গৃহনির্মাণ, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর স্থগিত সুদের ওপর ভর্তুকি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ঘোষিত প্যাকেজ অর্থনীতিতে কতটুকু গতি ফিরিয়ে আনতে পারবে, তা নির্ভর করছে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মোট ক্ষতির পরিমাণ এবং প্রণোদনা প্যাকেজের সুষ্ঠু ব্যবহার ও বাস্তবায়নের ওপর।

তবে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে মহামন্দা অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করে অর্থনীতির গতি সঞ্চার, কর্মচ্যুতদের চাকরির যোগান, দারিদ্র্যসীমায় অন্তর্ভুক্ত দরিদ্রদের দারিদ্র্যসীমার ওপর নিয়ে আসা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার মাঝে ভারসাম্য এনে জীবন-জীবিকার নিশ্চিত করাটাই হবে চ্যালেঞ্জ।

 লক্ষ করা গেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পে পণ্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। সমাজে ভোক্তা বেড়েছে, সাধারণ মানুষ উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের পর এভাবেই সমাজে আমূল পরিবর্তন আসে। করোনা পূর্ববর্তী সময়ে প্রযুক্তির আধুনিক সুবিধাকে গ্রহণ করে বিশ্বব্যাপী চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যে ঢেউ উঠেছিল, সেটিকে ধরে রেখে প্রযুক্তির সামগ্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করে উৎপাদন ব্যবস্থায় গতি সঞ্চার নিশ্চিত করতে পারলে চলমান অর্থনৈতিক মহামন্দা উত্তরণ সম্ভব হবে।

তবে এটা নির্ভর করছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সমূহ সম্ভাবনাকে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকাররা কিভাবে কাজে লাগাবে— তার ওপর। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে কোভিড-১৯-এর কারণে আর্থিক ঝুঁকি হ্রাসকরণের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে— এই মহামারির কারণে সৃষ্ট ক্ষতি পুষিয়ে আনতে এবং সবার জন্য অধিকতর উন্নত জীবনব্যবস্থার ভবিষ্যত নির্মাণ করতে কী ধরনের অর্থবহ পরিবর্তন আনা উচিত সে বিষয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ ধ্যান ধারণাকে একই প্ল্যার্টফর্মে অন্তর্ভুক্ত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে কোভিড-১৯ উত্তর বিশ্বমন্দা উত্তরণে ও সমৃদ্ধি অর্জনে উন্নত প্রযুক্তিই মূল বা প্রধান ভূমিকা পালন করবে; বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব কেন্দ্রিক ক্লাউড কম্পিউটিং, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ইত্যাদি প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিলব্ধ ধারণা আত্মীকরণ ও এর যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিতের মহাপরিকল্পনা নিতে হবে।

কোভিড-উত্তর চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যুগে পৃথিবীকে বদলে দেয়ার জন্য যে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলো রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো তথ্যপ্রযুক্তি খাত। এ প্রযুক্তি সর্বক্ষেত্রে আমাদের কার্যক্রমকে সহজতর করে দিয়েছে। কোভিড-কালীন সময়ে সম্পূর্ণ বিরূপ পরিবেশেও আমরা অনেক প্রয়োজনীয় কাজ ঘরে বসে সম্পন্ন করতে সক্ষম হচ্ছি এ প্রযুক্তির আশীর্বাদে। প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির গবেষণা ও নতুন নতুন উদ্ভাবনের ফলে সর্বক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলেছে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানকে আরো উন্নত ও সহজলভ্য করে তুলেছে।

শিক্ষা-সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, কৃষি অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা ইত্যাদি সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের উন্নয়নে প্রযুক্তির উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির নতুন নতুন গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রযুক্তিখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে ভবিষ্যত পৃথিবীকে বদলে দেয়ার জন্য প্রযুক্তির যে সকল সংস্কার ও আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রকল্পসমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

উল্লেখযোগ্য প্রকল্পসমূহের কোনটির আংশিক ব্যবহারের সুফল পৃথিবীর মানুষ ভোগ করছে। আবার কোনোটির সফলতা পাওয়ার প্রত্যাশায় দিন গুনছে। দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী ব্যবহার করে থাকি।

পণ্যসামগ্রীর উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ৫০ শতাংশ অপচয় করে নতুন পণ্যসামগ্রী উৎপন্ন করতে হয়। যার ফলে উৎপাদন খরচ অনেকাংশে বেড়ে যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অপ্টিমাইজ মেনুফেকচারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ এবং অপচয় হ্রাস করা সম্ভব।

মেনুফেকচারিংয়ের কাজে ব্যবহূত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অপ্টিমাইজ মেনুফেকচারিং প্রযুক্তি রোবটকে চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ডিজাইনের অ্যালগরিদম সেট করে দিলে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে স্বল্প কাঁচামাল ব্যবহার করে কোনো পণ্য উৎপাদন করতে সম্ভব হবে এবং পণ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অপ্টিমাইজ মেনুফেকচারিংয়ের মাধ্যমে মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজকে নির্ভুলতার সঙ্গে সম্পন্ন করা যাবে।

বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন ধরনের গ্রিন হাউজ গ্যাস সর্বোচ্চ মাত্রার অধিক পরিমাণে বিরাজ করছে, যা প্রাণীজগতের অস্ত্তিত্বের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে। এই গ্যাসসমূহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দেশ, সংস্থা, অনুষ্ঠান, ব্যক্তির মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে নিঃসরিত হচ্ছে। যাতায়াত, বাসস্থান, খাবার দাবার ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা গ্রিন হাউজ গ্যাস পরিবেশে নিঃসরণ করছি, যা পারতপক্ষে জলবায়ুর পরিবর্তন আরো ত্বরান্বিত করছে।

বায়ুমণ্ডলের নিঃসরিত গ্যাসমূহের মধ্যে বিশেষ কার্বন-ডাই অক্সাইড এবং মিথেনের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা কার্বন পদচিহ্ন হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক পদ্ধতি। প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে সরাসরি কার্বন নিঃসরণ করে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সুদূরপ্রসারি শক্তির সন্ধান করতে হবে, যার মাধ্যমে কার্বন ফুটপ্রিন্টয়ের পরিমাণ হ্রাস করতে সহায়তা করবে। কার্বন ইঞ্জিনিয়ারিং নামে কানাডিয়ান একটি কোম্পানিসহ পৃথিবীর অনেক বড় বড় সংস্থা প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।

যেভাবে একদিন কম্পিউটার বা ইলেকট্রনিক প্রসেসর আমাদের সভ্যতাই বদলে দিয়েছিল, সেভাবে আবারো প্রযুক্তি দুনিয়া ও মানবজাতির ভবিষ্যত বদলে দিতে আসছে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। সেটি কিভাবে কাজ করে সেটা বুঝে উঠা খুবই দুষ্কর। কিন্তু তা কিভাবে সব বদলে দেবে তা আন্দাজ করা খুব কঠিনও নয়। বাইনারি সিলিকন কম্পিউটারের সীমাবদ্ধতা এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞ/ বিজ্ঞানীরা নানামুখী গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তবে  এই প্রযুক্তির কম্পিউটার শুরু থেকেই সিলিকন কম্পিউটারের চেয়ে শত শত গুণ দ্রুত কাজ করতে সক্ষম। কোয়ান্টাম দুনিয়া আমাদের চেনা জানা দুনিয়ার মতো কাজ করে না। সেটা কী রকম, তার আলোচনা এ পরিসরে সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে শুধু ক্রিপ্টোগ্রাফি নয়, জটিল সব পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীব-বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও অন্যান্য তথ্যভিত্তিক মডেলগুলো সহজেই কোয়ান্টাম কম্পিউটারে করা যাবে।

এর ফলে দুনিয়া এভাবে বদলে যাবে যা এখনো কল্পনা করা যায় না। ভ্রুণের ডিএনএ নিয়ে তা পরীক্ষা করে বলে দেয়া যাবে তার চেহারা কেমন হবে, তার বুদ্ধিবৃত্তি কেমন হবে, মৃত্যুর সম্ভাব্য সময় কখন। বিশাল পরিমাণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতিবিদরা ১০০ বছরে বিশ্বের অর্থনীতি কিভাবে পরিবর্তন হবে, তা আন্দাজ করতে পারবেন।

আসলে কোনো কিছুই আপাতত আমরা সঠিকভাবে আন্দাজ করতে পারবো না। শুধু এটুকুই বলা যাবে-কোয়ান্টাম যুগ আসছে এবং আমাদের চেনা বিশ্বের অনেক কিছুই বদলে যাবে। স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য শারীরিক সুস্থতা জরুরি। সৃষ্টির পর থেকে মানবদেহের অসুস্থতা ও তা নিরাময়ের পথ মানুষ নিজেই খুঁজে নিয়েছে। ধাপে ধাপে নানা বাঁকে এগিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডায়েটের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বেগবান করবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় অসাধারণ অবদান রাখবে। রোবটিক টেকনোলজি বিশ্বস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
 
বিদ্যমান উৎপাদন ও ভোক্তা ব্যবস্থায় নির্গত কার্বন কিভাবে আমাদের প্রকৃতি পরিবেশকে বিপর্যস্ত করেছে, করোনার প্রাদুর্ভাব সেদিকটি উন্মোচন করেছে। বৈশ্বিক জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব শুধু প্রকৃতি পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়নি, বরং এর বিরূপ আচরণ মানবস্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

যার প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বকে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিষয়টি মাথায় রেখে ডিজিটাল উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে আগামী দিনে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে মনোযোগী হতে হবে। এতে করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ মোকাবিলা তহবিলের অর্থ বিশ্বের দারিদ্র্যসীমার জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যয় করা সম্ভব হবে। করোনার বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি সামনে আসায় বিদ্যমান স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বণ্টন ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ভার্চুয়াল সেবার বিষয়টি আমাদের সামনে এসেছে।

কিন্তু বিদ্যমান ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থায় বিশ্বব্যাপী ভার্চুয়াল কার্যক্রম পরিচালনার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ভার্চুয়াল সিস্টেম আমাদের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, সেবা, যোগাযোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থায় যথেষ্ট কার্যকর সহযোগিতা দিতে পারেনি। বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারে অধিকতর কার্যকর পদ্ধতি প্রবর্তন করা গেলে কোভিড-এর প্রতিকূল পরিবেশে শিক্ষার্থীদের পাঠদান বাঁধাগ্রস্ত হতো না।

চলমান প্রতিকূল পরিস্থিতি ও অনাগত অনুরূপ বিরূপ পরিস্থিতিতে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে কিভাবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সচল রাখা যায়, সে বিষয়ে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) সুনির্দিষ্ট সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহে একটি প্রস্তাবনা পাঠায়।

তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মন্ত্রণালয়ের ধীরগতি পন্থা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতির পথে অন্তরায় হয়ে রয়েছে। আইডিইবির সুপারিশ গ্রহণ করে আগামী দিনে কোভিড-এর মতো বিরূপ পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হবে। বিষয়টি মাথায় রেখে আগামীর যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের ফাইভ-জি যুগে প্রবেশে মনোযোগী হতে হবে।

বিশ্বব্যাপী করোনার বিরূপ প্রভাবে যখন দুর্ভিক্ষের শঙ্কার জন্ম নিয়েছে, তখন খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষির গুরুত্ব সামনে চলে আসে। আমাদের মতো জনবহুল দেশে খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ এবং বণ্টনের জন্য ব্লক চেইন টেকনোলজি ব্যবহার ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে আধুনিকায়ন করা গেলে আগামী দিনে এ সেক্টরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন উন্মোচিত হবে।

তাই করোনা-উত্তর কৃষি অর্থনীতি চাঙ্গা করে তোলার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে মনোযোগী হতে হবে। মানবসভ্যতায় দুর্যোগ ও মহামারি আসবে। এ বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা ও সংকট উত্তরণে সভ্যতার ইতিহাসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই অন্যতম নিয়ামকশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

কোভিড-১৯-এর ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারের জন্য জীবন-জীবিকা, উন্নয়ন-উৎপাদন ও সমৃদ্ধির প্রতিটি ধাপে চতুর্থ শিল্পবিল্পবের প্রাযুক্তিক সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশের যে রূপকল্প ইতোমধ্যে ঘোষিত হয়েছে, সেই সমৃদ্ধির মূল ভিত্তিই হবে প্রযুক্তি।

লেখক : সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)

আমারসংবাদ/এআই