মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০

১২ কার্তিক ১৪২৭

ই-পেপার

শহীদুল হক

প্রিন্ট সংস্করণ

অক্টোবর ১৭,২০২০, ০৫:৩২

অক্টোবর ১৮,২০২০, ০২:১০

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রভাব ও দেশের উন্নয়ন

বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গিয়েছেন। স্বপ্ন ছিলো সোনার বাংলা গড়ার। সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। শোষণ-বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে প্রত্যেক মানুষকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। জাতির পিতার কাছে জনগণের থেকে প্রিয় আর কিছু ছিলো না। স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি চক্র ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতার স্থপতি মহাকালের মহাপুরুষকে সপরিবারে হত্যা করে।

 বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা, শিশু রাসেল ও নারীসদস্যসহ পরিবার ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সকলকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বাংলার ইতিহাসে কলঙ্কময় অধ্যায় সৃষ্টি করে তারা হত্যার রাজনীতির অবতারণা করে। গণতন্ত্রকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে।

হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে আইনের শাসন সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত করে। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থান করায় বেঁচে যান। কিন্তু খুনি মোশতাক ও জেনারেল জিয়া তাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরতে দেন নাই। বাধ্য হয়ে তারা ভারতে ছয় বছর নির্বাসিত জীবনযাপন করেছেন।

১৯৮১ সালের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করে। তারপর জনগণের চাপের মুখে জিয়া সরকার শেখ হাসিনাকে দেশের ফিরে আসার অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।

১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা তার পিতার প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পদার্পণ করেন। সেদিন বিমানবন্দরে লাখো জনতা তাকে অভ্যর্থনা জানাতে যায়। বিমানবন্দর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত লাখ লাখ জনতা রাস্তার দোপাশে ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জমায়েত হয়। ঐদিন জনগণের স্মৃতির পাতায় বঙ্গবন্ধুর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির পাকিস্তান কারাগার থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য উদ্ভাসিত হয়। শেখ হাসিনার সাথে জনতাও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।

শেখ হাসিনা বাবা-মা, ভাই-ভাবি, আত্মীয়স্বজন সবাইকে রেখে স্বামীর সাথে বিদেশে যান। সাথে ছিলো ছোট বোন রেহেনা। ছয় বছর পর ফিরে এসে কাউকে পাননি। যে বাবা দেশ স্বাধীন করেছেন, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের স্থান করে দিয়েছিলেন, সেই বাবাকে সপরিবারে তারই দেশের কিছু বিশ্বাসঘাতক নির্মমভাবে হত্যা করেছে। দেশে ফিরে সর্বহারা শেখ হাসিনার মনের ব্যথা ও কষ্ট কত গভীরে তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।

তারপরও স্বজনহারার বেদনা বুকে নিয়েই তিনি জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে পিতার স্বপ্ন পূরণের সোনার বাংলা তৈরি করার প্রত্যয়ে নিজেকে নিয়োজিত করলেন। শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে তিনি এগিয়ে চলার দৃঢ় সংকল্প নিলেন। জেনারেল জিয়া নিষ্ঠুর ও অমানবিক ছিলেন। শেখ হাসিনাকে ৩২ নং ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত সেই পৈতৃক বাড়িতে ঢুকতেও দেননি। শেখ হাসিনা একবুক ব্যথা নিয়ে রাস্তায় মিলাদ পড়ে আপনজনদের জন্য দোয়া করেছিলেন।

শেখ হাসিনা যোগ্য পিতার সুযোগ্য কন্যা। তার ধমনীতে জাতির পিতার রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। তাকে কোনোভাবে দাবিয়ে রাখা যায়নি। তিনি জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। শপথ নিয়েছিলেন গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে। তিনি পিতার ন্যায় বাংলার আনাচে-কানাচে, গ্রাম-গঞ্জ ও শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।

সামরিক শাসক ও সামরিক আইনের বিরুদ্ধে কথা বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য জনগণকে সংগঠিত করেন। এ লক্ষ্যে জনমত তৈরির জন্য সমাবেশ মিছিল, হরতাল ঘেরাও ইত্যাদি রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে দাবি মানার জন্য চাপ অব্যাহত রাখেন।

স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘোষণা করেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগসহ অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়। বিএনপি প্রাথমিকভাবে নির্বাচনে রাজি থাকলেও তাদের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। শেখ হাসিনা ঐ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন আন্দোলনের কৌশল হিসেবে। তিনি জানতেন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেবে না।

জনগণের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সামরিক সরকারের চরিত্র উন্মোচন করার জন্যই শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। বাস্তবিকপক্ষে তাই হয়েছিল। নির্বাচন একটা প্রহসন ছিলো। প্রহসনের নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি জয়লাভ করে। জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসনে ও আওয়ামী লীগ ৭৬টি আসনে জয়লাভ করে।

শেখ হাসিনা নির্বাচনের কারচুপির অভিযোগ এনে সংসদের ভেতর ও বাইরে আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনের মুখে ১৯৮৭ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকার পার্লামেন্ট বিলুপ্ত ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের মধ্যেই এরশাদ পুনরায় ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ পার্লামেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ সকল বৃহৎ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বয়কট করে। নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসনে জয়লাভ করে। আ স ম আব্দুর রবের নেতৃত্বে সম্মিলিত বিরোধী দল ১৯টি আসনে জয়লাভ করে বিরোধী শিবিরে বসে।

শেখ হাসিনা জোটের শরিকদলসহ আন্দোলন চালিয়ে যান। সাথে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল এরশাদের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। আন্দোলন গণবিস্ফোরণ রূপ নিলে এরশাদ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। এরশাদ সরকারের পতন হয় এবং ৪র্থ পার্লামেন্ট বিলুপ্ত হয়। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন অস্থায়ী সরকারের প্রধান হন। নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন। এরশাদকে গ্রেফতার করে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্দলীয় অস্থায়ী সরকারের অধীনে ৫ম পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামী লীগ এগিয়ে থাকলেও বিএনপি ১৪০টি আসনে এবং আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসনে জয়লাভ করে।

বিএনপি ৩০.৮% ও আওয়ামী লীগ ৩০.১% পপুলার ভোট পান। নির্বাচনে পরাজয়ের দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে চাইলেও নেতাকর্মীদের অনুরোধ ও আন্দোলনের মুখে তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে যান। তিনি পুরোদমে দলীয় ও সংসদের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

শেখ হাসিনা দাবি তোলেন— সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার গঠনের। তিনি অপরাপর রাজনৈতিক দলের সমর্থন আদায়েও সক্ষম হন। বিএনপি সংসদীয় পদ্ধতির সরকার গঠনে অনীহা প্রকাশ করে। শেখ হাসিনা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের সমর্থন নিয়ে বিএনপিকে বাধ্য করেছিলেন parliamentary forum of Govt--এ ফিরে আসতে। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এটা শেখ হাসিনারই অর্জন।

শেখ হাসিনা পার্লামেন্টে বিরোধী নেতা হিসেবে অত্যন্ত সরব ছিলেন। সরকারের এবং পার্লামেন্টে অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। প্রতিবাদের কৌশল হিসেবে বারবার সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াক আউট করেন। মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্যর মৃত্যু হলে সেখানে উপনির্বাচন হয় ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ। বিএনপি ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হেরে যায়।

তাদের জনপ্রিয়তা কমে নাই তা প্রমাণ করার জন্য বিএনপি সরকার মাগুরার উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করে তাদের প্রার্থীকে জয়লাভ করায়। শেখ হাসিনা কঠিন প্রতিবাদ করেন। তিনি তার দলের সকল সংসদ সদস্যসহ একযোগে সংসদ থেকে পদত্যাগ করায় বিএনপি সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে।

শেখ হাসিনা দাবি তোলেন নিরপক্ষে ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের। তিনি কেয়ারটেকার সরকারের রূপরেখাও দেন। কিন্তু বিএনপি তা আমলে না নিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ পার্লামেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে।

আওয়ামী লীগসহ অনেক রাজনৈতিক দল ঐ নির্বাচন বর্জন করে। বিএনপি এককভাবে ৩০০ আসনে জয়ী হয়। গোটা জাতি এ নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করে। শেখ হাসিনা তার নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার দাবিতে অটল থাকেন এবং আন্দোলন চালিয়ে যান।

১৯ মার্চ ১৯৯৬ তারিখে ৬ষ্ঠ পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন ঢাকা হয়। ঐ পার্লামেন্টে শেখ হাসিনার দাবি মোতাবেক কেয়ারটেকার সরকারের বিধান রেখে সংবিধানের ত্রয়োদশ (১৩তম) সংশোধনী পাস হয়। কেয়ারটেকার সরকারের দাবি আদায় শেখ হাসিনার বিজয়। ৩০ মার্চ ১৯৯৬ তারিখে ৬ষ্ঠ পার্লামেন্ট ভেঙে যায়। কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে ১২ জুন ১৯৯৬ তারিখে ৭ম পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিচারপতি হাবিবুর রহমান কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে। বিএনপি ১১৬টি জয়লাভ করে। জাতীয় পার্টি পায় ৩২টি। আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে।



জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর জিয়া ও এরশাদের সামরিক সরকার আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুকে নিশ্চিহ্ন করার বা মুছে ফেলার জন্য নানা ষড়যন্ত্র ও কৌশল নিয়েছিল। ন্যক্কারজনকভাবে ইতিহাস বিকৃত করেছে।

শেখ হাসিনা এর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছেন। জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থনে সিক্ত আওয়ামী লীগ সমহিমায় রাজনৈতিক অঙ্গনে সরব ছিলো বিধায় তাদের হীন উদ্দেশ্য হাসিল হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগই নিয়ন্ত্রণ করেছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনা তার পিতার স্বপ্ন সোনার বাংলা নির্মাণে এবং দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য নানা পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেন।

বিভিন্ন সেক্টরে উন্নয়ন করেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আনেন। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নানামুখী প্রকল্প চালু করেন। দেশের অর্থনীতির বেশ উন্নয়ন হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়। ভারতের সাথে ফারাক্কা চুক্তি করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যায় রাজনৈতিক সমাধান আনেন। পার্বত্য শান্তি চুক্তি করেন। শান্তি চুক্তির আওতায় শান্তি বাহিনীর সদস্যরা তাদের অস্ত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতে সমর্পণ করে। বিশ্বের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা বিরল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও আন্তরিকতায় এটা সম্ভব হয়েছিল। শেখ হাসিনার সরকার ভারতের সাথে ফারাক্কা পানির চুক্তি করেন। এসব শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়োকোচিত প্রজ্ঞারই পরিচায়ক।

একুশ বছর পর ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেন। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে খুনি মোশতাক ও জিয়া সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধ করে দেয়। এই আইন বাতিলের মাধ্যমে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু করেন।

মেট্রোপলিটন জজ ১৫ জন খুনির ফাঁসির আদেশ দেন। হাইকোর্টের আপিলে ১২ জনের ফাঁসির রায় বহাল রাখে। বিএনপি-জামায়াত ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে নানা টালবাহানা করে সুপ্রিম কোর্টে বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার আপিল শুনানি বন্ধ রাখেন। আওয়ামী লীগ ২০০৮-এর নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে আপিল নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করেন। ১২ জন খুনির ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন।

২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পাঁচ খুনির ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। শেখ হাসিনা জেলহত্যা মামলারও বিচার সম্পন্ন করেন। বিচারগুলো ট্রাইব্যুনালে না করে তিনি সাধারণ প্রক্রিয়ায় সাধারণ আদালতেই সম্পন্ন করেন। জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ২০০১ সালে ক্ষমতা অর্পণ করেন। বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অষ্টম পার্লামেন্টের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু এ সরকার দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিন থেকেই একের পর এক বিবর্তনমূলক পদক্ষেপ নেয়ায় তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়। তারা এমন আবহ তৈরি করেছিল তাতে মনে হচ্ছিল বিএনপি ক্ষমতায় আছে।

২০০১ সালের অক্টোবরের ১ তারিখে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় হয়। আওয়ামী লীগ ৬২টি আসনে এবং বিএনপি ১৯৩টি আসনে জয়লাভ করে। বিএনপি ৪১.৪০% এবং আওয়ামী লীগ ৪০.০২% পপুলার ভোট পায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আচরণে অনুমান করা যাছিল যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে না। শেখ হাসিনা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াতের ক্ষমতাকালে তাদের মদতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবশে গ্রেনেড হামলা হয়। হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিলো শেখ হাসিনাকে হত্যা করা। একই সাথে আওয়ামী লীগের সকল নেতাকে হত্যা করে দলকে নেতৃত্বশূন্য করা। হামলায় ২২ জন নিহত হন। তিন শতাধিক আহত। বিএনপি-জামায়াত ঐ মামলার সুষ্ঠু তদন্ত না করে খুনিদের বাঁচিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে ২১ আগস্ট গ্রেনেডহামলা মামলার সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার নিশ্চিত করেন।

বিএনপি ২০০৬ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০১ সালের আদলে করার জন্য নীলনকশা তৈরি করে। ইয়াজউদ্দীন সাহেব রাষ্ট্রপতি। সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিএনপির পরিকল্পনায় বাঁধ সাধে আওয়ামী লীগ।

কারণ তিনি বিচারপতি হওয়ার পূর্বে বিএনপির নেতা ছিলেন। তাকে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান করার জন্যই বিএনপি বিচারপতিদের বয়স দুবছর বাড়িয়ে অবসরের বয়স ৬৭ করে। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে অচল অবস্থা হওয়ায় সেনাবাহিনী হস্তক্ষপ করে। সেনা কর্তৃপক্ষ ফখরুদ্দীন সাহেবকে প্রধান উপদেষ্টা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে। নেপথ্যে সেনাবাহিনী সরকার পরিচালনা করে। এই সরকার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে রাজনীতি সংস্কার আনার চেষ্টা করে।

দুই নেত্রীকেই গ্রেপ্তার করে। শেখ হাসিনা দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তিনি অত্যন্ত সাহসের সাথে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করেন। দুবছর পর নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। দুই নেত্রীকে মুক্তি দেয়। ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়।

ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে জয়লাভ করে। বিএনপি মাত্র ৩০টি আসনে জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ ৪৯% এবং বিএনপি ৩৩.২% পপুলার ভোট পায়। আওয়ামী লীগের এ সাফল্যের পেছনে শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বই মুখ্য। তিনি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় দলকে সংগঠিত করেছেন এবং জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০০১ এবং ২০০৬ এবং পরবর্তীতে ২০০৭-২০০৮ এর কেয়ারটেকার সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিলো। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা তাদের দ্বারা হয়রানি ও ক্ষতিগ্রস্ত হন। কেয়ারটেকার সরকারের আমলে একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিনষ্ট হয়। হাইকোর্টও কেয়ারটেকার সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেয়। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী সরকার পার্লামেন্টে বিল এনে কেয়ারটেকার সরকার পদ্বতি বিলোপ করে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং দেশের অগ্রগতির জন্য ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেল হত্যা, ২১ আগস্ট হত্যা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করে শেখ হাসিনা দেশকে কলঙ্কমুক্ত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন।

১৯৮৩-২০০৭ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনাকে নয় বার গ্রেপ্তার করা হয়েছে, প্রায় উনিশ বার তাকে হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু তাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। তার ধমনীতে বঙ্গবন্ধুর রক্ত প্রবাহিত। তাই মৃত্যুর ভয় তাকে তার অভীষ্ট থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করায় আওয়ামী লীগ একটানা প্রায় ১২ বছর যাবত ক্ষমতায় আছে। তাই আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে সেগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছে। প্রত্যেক সেক্টরে উন্নয়ন হয়েছে। সামাজিক সূচক বৃদ্ধি পেয়েছে।

 খাদ্য উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, বাণিজ্য প্রসার, বৈদিশিক রেমিটেন্স, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ, রপ্তানি আয়, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি, মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, শিক্ষার হার, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ উৎপাদন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব, ঈর্ষণীয় ও দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে। স্বল্পোন্নত থেকে দেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে এবং মধ্যম আয়ের দেশের পথে। দেশ উন্নয়নশীল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গ বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বীকৃতি দিয়েছে ও প্রশংসা করেছে।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল, মহাসড়কগুলো চার লেনে উন্নীতকরণ ইত্যাদি মেঘা প্রজেক্টসহ অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন দ্রুত এগিয়ে চলছে। কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির ওপর আঘাত হানলে বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে এখনো ভালো।

শেখ হাসিনার সরকার ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ রূপকল্প ঘোষণা করেন। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে রূপকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। ডেলটা পরিকল্পনা ২১০০ প্রণয়ন করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে রূপকল্পের লক্ষ্য অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ।

এসব অর্জন সবই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ, দূরদর্শী ও গতিশীল নেতৃত্বের জন্যই সম্ভব হচ্ছে। তার রাষ্ট্রনায়োকোচিত প্রজ্ঞা তাকে বিশ্ব নেতৃত্বের কাতারে নিয়ে গেছে। তার নেতৃত্ব, দেশ ও জনগণের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ, পরিকল্পনা, নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন, শিক্ষার প্রসার, এসজিডি অর্জনে সাফল্য, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া ইত্যাদি বিষয়গুলোতে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। তাই তিনি একটির পর একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে প্রায় চল্লিশটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার, সম্মাননা পেয়েছেন যা তার নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

লেখক : সাবেক আইজিপি

আমারসংবাদ/এআই