বৃহস্পতিবার ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

৮ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

ফারুক আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ১২,২০২০, ০৭:১০

ফেব্রুয়ারি ১২,২০২০, ০৭:২৩

পরিবর্তন আসছে সিটি কর্পোরেশন আইনে

স্বপদে থেকেই প্রার্থী হবেন মেয়ররা

আইনের বেড়াজালে বন্দি ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলররা। নির্বাচনের তিনদিন পর বিজয়ীদের নাম ও পদসহ নির্বাচন কমিশন (ইসি) গেজেট প্রকাশ করলেও স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইনের জালে দায়িত্ব পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের। ফলে সিটি নির্বাচনে মেয়ররা স্বপদে থেকেই নির্বাচন করতে পারবেন।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯-এর ৯ ধারার ২ উপধারার (ঙ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘কোনো ব্যক্তি মেয়র বা কাউন্সিলর নির্বাচিত হইবার যোগ্য হইবেন না, যদি প্রজাতন্ত্রের বা সিটি কর্পোরেশনের বা কোনো সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের বা অন্য কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কোন লাভজনক পদে সার্বক্ষণিক অধিষ্ঠিত থাকেন।’

এই আইনের ধারায় মেয়রদের পদত্যাগ করে নির্বাচন করতে হয়। এতে ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন ছাড়াও চট্টগ্রাম ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনেও জটিলাতা সৃষ্টি হয়। এ আইনটি সংস্করণের পরিকল্পনা করছে সরকার।

জানা যায়, ঢাকা দুই সিটিতে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত দুই মেয়রপ্রার্থী নির্বাচিত হলেও আইনের কারণে দায়িত্ব পাননি। এই জটিলতা দূরীকরণে আইনে পরিবর্তন আসছে। যেখানে সিটি মেয়র স্বপদে থেকেই নির্বাচন করতে পারবেন।

স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০০৯ অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর মেয়র বা কাউন্সিলরদের নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করবে। এ হিসেবে চলতি মাসের শেষের দিকে কিংবা মার্চের প্রথম সপ্তাহে শপথ নেবেন বিজয়ীরা।

এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিটি মেয়রের শপথবাক্য কোনদিন পাঠ করাবেন তা নির্ধারণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে। এখনো শপথবাক্যের দিন নির্ধারণ হয়নি।

তবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের শাপলা হলে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। একই দিন নবনির্বাচিত কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলররাও শপথ পাঠ করবেন।

মেয়রকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে কাউন্সিলরদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদটি লাভজনক হওয়ায় কেউ পরের মেয়াদে নির্বাচন করতে চাইলে আইন অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পরপরই সেই মেয়রকে পদত্যাগ করতে হবে। আর তফসিল ঘোষণা হবে মেয়াদপূর্তির আগে ১৮০ দিনের ভেতরে।

নির্বাচনটি যদি মেয়রের মেয়াদপূর্তির শেষদিকে অনুষ্ঠিত হয় তাহলে তেমন কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু বেশ আগে অনুষ্ঠিত হলেই দেখা দেয় মেয়রের অনুপস্থিতি ও অন্তর্বর্তী দায়িত্ব পালনে জটিলতা।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের চলমান নির্বাচনের পর নির্বাচিতদের বসে থাকতে হবে সাড়ে তিন মাস। আইনের বাধা থাকায় চাইলেও এর আগে দায়িত্ব পাবেন না নবনির্বাচিতরা।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে নির্ধারিত মেয়াদপূর্তির আগেই কারো দায়িত্ব পালনের সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়া মানে ওই মেয়র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, পাশাপাশি জনগণকেও সেবা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা।

কারণ, মেয়র দায়িত্ব ছাড়ার পর প্যানেল মেয়র বা প্রশাসক কারোরই আর্থিক বিষয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে নাগরিকদের সুবিধাও দিতে পারেন না অন্তর্বর্তী দায়িত্বরত ব্যক্তি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতোপূর্বে এই আইনের সংকটটি সেভাবে বোঝা যায়নি। কারণ, নারায়ণগঞ্জ বা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে মেয়রের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগে।

অন্য সিটি কর্পোরেশনগুলোতেও মেয়াদ পূরণ হওয়ায় বা কাছাকাছি থাকায় বিষয়টি সেভাবে নজরে আসেনি। তবে এবার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়রের পদ থেকে আতিকুল ইসলামকে পদত্যাগ করতে হয়েছে তার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার সাড়ে চার মাস আগে।

ডিএনসিসির চলতি বোর্ডের মেয়াদ আগামী ১৪ মে শেষ হওয়ার কথা, কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ায় প্রার্থিতার শর্ত অনুসারে গত ৩০ ডিসেম্বরই পদত্যাগ করতে হয়েছে তাকে।

ফলে এই নির্বাচনে জয়-পরাজয় যাই ঘটুক না কেন, নির্ধারিত মেয়াদের প্রায় সাড়ে চার মাস হারিয়ে ফেলছেন আতিকুল। নির্বাচনে জয়ী হয়ে তাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে চলমান বোর্ডের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ আমার সংবাদকে বলেন, আইন অনুযায়ী, পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। ১৮০ দিনের মধ্যে যদি নির্বাচন করার সুযোগ থাকে, সেখানে ইসি অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে নির্বাচনি তারিখ নির্ধারণ করে।

এরপরও কিছু জটিলতা দূর করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ভাবছে, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদত্যাগ না করে স্বপদে বহাল থেকে নির্বাচন করার। এটি নিয়ে নতুন পরিকল্পনা চলছে।

কারণ বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি প্যানেল মেয়র দিয়ে চলছে। যদি মেয়র স্বপদে থেকে নির্বাচন করতে পারতেন তাহলে এমন সমস্যা হতো না। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মোহাম্মদ সাঈদ খোকন মেয়র আছেন, তিনি তার মেয়াদপূর্ণ করবেন। এজন্য সিটি কর্পোরেশন আইনে সংশোধনী আনার পরিকল্পনা করছে মন্ত্রণালয়।

সচিব আরও বলেন, বর্তমান আইনে বলা আছে প্রত্যেক পরিষদ পাঁচ বছর মেয়াদপূর্ণ করবে। পাঁচ বছর পূর্ণ না হওয়ার আগ পর্যন্ত নতুন পরিষদ দায়িত্ব নেবে না। ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনে মেয়রের সঙ্গে কাউন্সিলররা আছেন।

কাউন্সিলরসহ মেয়রকে বলা হয় পূর্ণ পরিষদ। মেয়র এককভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না। এখানে পুরো পরিষদ দায়িত্বগ্রহণ করবে। সুতরাং নতুন পরিষদের মেয়রসহ কাউন্সিলরদের অপেক্ষা করতে হবে।

দুই সিটি কর্পোরেশনের সূত্র জানায়, বর্তমান বোর্ডের পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই দায়িত্ব নেবেন বিজয়ী দুই মেয়র আতিকুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটির চলমান বোর্ডের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১৬ মে এবং উত্তর সিটির মেয়াদ শেষ হবে ১৩ মে।

এজন্য জয়ী হলেও নবনির্বাচিত মেয়রদের আরও চার মাস দায়িত্ব পেতে অপেক্ষা করতে হবে। কারণ সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত হয় স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইনের দ্বারা।

এই আইনের উপ-ধারা (১)এর দফা (খ)তে উল্লিখিত আছে ‘নির্বাচিত মেয়র অথবা কাউন্সিলর কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যভার গ্রহণ করিতে পারিবেন না।

আর উপ-ধারা (১)-এর দফা (খ) দফায় বলা হয়েছে, ‘কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হইবার ক্ষেত্রে, উক্ত মেয়াদ শেষ হইবার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করিতে হইবে।

নগরবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কিছু আইনের কারণে কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয় বিধায় এসব আইনের সংস্কার প্রয়োজন। নিয়ম ও আইনের বেড়াজালে অনেক কিছুই সময়মতো করা যায় না। সময় উপযোগী করতে আরও কিছু আইনও সংস্কার করা দরকার।

সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেয়াদ সম্পর্কে ধারা ৬-এ বলা হয়েছে, কর্পোরেশনের মেয়াদ উহা গঠিত হইবার পর উহার প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হইবার তারিখ থেকে পাঁচ বৎসর হইবে, তবে শর্ত থাকে যে, সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও উহা পুনর্গঠিত সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করিয়া যাইবে।

এক্ষেত্রে উত্তর সিটির প্রথম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৫ সালের ১৩ মে, আর দক্ষিণ সিটির প্রথম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয় একই বছরের ১৬ মে। এ হিসেবে উত্তর সিটির নবনির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম ১৪ মে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন আর দক্ষিণ সিটিতে নবনির্বাচিত মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন চলতি বছরের ১৭ মে ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন জানিয়েছেন, তার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কাউন্সিলের মেয়াদ আগামী ১৬ মে পর্যন্ত রয়েছে। আইন অনুযায়ী সে পর্যন্ত বর্তমান বোর্ড দায়িত্ব পালন করবে। এরপর নতুন নির্বাচিত বোর্ড দায়িত্ব গ্রহণ করবে।

দক্ষিণ সিটির নবনির্বাচিত মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, গত মেয়াদে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা পূর্ণ মেয়াদ পার করবেন। তাদের মেয়াদ শেষ হলেই আমরা দায়িত্বভার গ্রহণ করবো। মেয়াদ পূরণের একদিন আগেও দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ নেই। একই কথা বলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সদ্যবিদায়ী ও নব নির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম।

প্রসঙ্গত, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন দায়িত্ব পালন করছেন। আর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে কাউন্সিলর জামাল মোস্তফাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। উত্তর সিটি মেয়র শপথ গ্রহণের আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল থাকবেন।

এবারের সিটি নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে মেয়র পদে প্রার্থী ছিলেন ৬ জন, কাউন্সিলর পদে ২৫১ জন এবং সংরক্ষিত আসনে ৭৭ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। উত্তর সিটিতে ওয়ার্ড রয়েছে ৫৪টি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ভোটার ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭ এবং নারী ভোটার ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৭০৬ জন। প্রথমবারের মতো ঢাকার দুই সিটিতেই একযোগে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হয়।


আমারসংবাদ/এসটিএমএ