সোমবার ০৬ এপ্রিল ২০২০

২৩ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

আসাদুজ্জামান আজম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২৪,২০২০, ০২:২৯

মার্চ ২৪,২০২০, ০২:২৯

করোনা ভাইরাসের প্রভাব শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা

মরণঘাতক করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট বিশ্বমন্দা আর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিভিন্ন মহলে। বিশেষ করে বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের অন্যতম খাত তৈরি পোশাকশিল্পে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আর এ কারণে আগামী ঈদ-উল ফিতরের আগে গার্মেন্টশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ হবার আশঙ্কা করছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। আগামী ঈদের আগে গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা ও বোনাস সময়মত পরিশোধ করতে পারবেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি বলে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

অতি সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের প্রকোপ, শিল্প, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার, শেয়ারবাজারের দরপতন, সীমান্ত হাট বন্ধ, গণপরিবহনে চলাচলে ভীতি, গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক সংবাদের নেতিবাচক প্রভাবসহ বর্তমান দেশের সার্বিক পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এছাড়া সাম্প্রতিক করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এ শ্রমিকদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গার্মেন্টশিল্পের যন্ত্রপাতি, ফেব্রিক্স, সূতা, বোতাম, রংয়ের কেমিক্যাল ও কাঁচামালের মোটা চাহিদার ৭০ শতাংশের রপ্তানিকারক দেশ চীন থেকে আমদানি বন্ধ রয়েছে।

এসব সরঞ্জামাদির সংকটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি গার্মেন্ট কারখানার উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে। এতে অর্থনীতির পাশাপাশি ওইসব কারখানায় কর্মরতরা বিপাকে পড়বেন। এতে তাদের বেতনভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে পোশাক কারখানা আছে প্রায় ৪ হাজার ৬২১টি। এর মধ্যে সরাসরি রপ্তানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছে প্রায় আড়াই হাজার। এ খাতে প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করে।

বিজিএমইএ সূত্রে মতে, করোনা ভাইরাসের কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিতাদেশের পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে।

গত বুধবার পর্যন্ত ৮৪ পোশাক কারখানার ১০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়েছে, যা দেশি মুদ্রায় ৮৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি।

পোশাক রপ্তানির বড় বাজার ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় আরও ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা।

চীনে গত বছরের নভেম্বরে প্রথম করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সর্বশেষ ভাইরাসটি দেড় শতাধিকের উপরে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাসটির কারণে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

অনেক পোশাকের ব্র্যান্ড তাদের শত শত বিক্রয়কেন্দ্র ঘোষণা দিয়ে বন্ধ রেখেছে। এই শিল্পের উদ্যোক্তাদের দাবি, করোনা ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো বাংলাদেশি পোশাকের বড় বাজার।

গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। তার মধ্যে ৬১ দশমিক ৯১ শতাংশ বা ২ হাজার ১১৩ কোটি ডলারের পোশাকের গন্তব্য ছিলো ইইউভুক্ত দেশ। আর যুক্তরাষ্ট্রে গেছে ৬১৩ কোটি ডলারের পোশাক।

পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সংবাদ মাধ্যেমকে বলেন, ‘ইউরোপের ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিভিন্ন কারখানার ৭৩ লাখ ডলারের ক্রয়াদেশ স্থগিত করছে।

সেটি বেড়ে ১ কোটি ডলারে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণত গ্রীস্ম মৌসুমে ব্র্যান্ডগুলো বড় ব্যবসা করে থাকে। তার আগেই করোনা আঘাত হেনেছে। ইউরোপে এইচঅ্যান্ডএমের ৬২ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ।

সরকারের ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদকে সামনে রেখে প্রতি বছরই অনেক গার্মেন্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি সময়মত পরিশোধ করতে না পারায় এ সেক্টরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, ভাঙচর, রাস্তা অবরোধ ইত্যাদি আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নের ঘটনা ঘটে থাকে।

করোনা ভাইরাসের কারণে উৎপাদন সরঞ্জামাদির অভাবে এ বছর গার্মেন্ট কারখানাগুলো চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার না পাওয়ায়, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ক্ষদ্র ও মাঝারি অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর নেতিবচাক প্রভাব আগামী ঈদ-উল-ফিতরে পড়তে পারে। যথা সময়ে বেতন বোনাস পরিশোধ না করলে তারা আইনশৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এ কারণে পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন ।

পাশাপাশি শ্রমঘণ এলাকা বিশেষ করে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি, অন্যান্য কল-কারখানা, বস্তি এলাকা, বিহারী ক্যাম্প এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিসহ অনসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সাবান, হ্যান্ডওয়াস, সেনিটাইজার, টিস্যু পেপার, মাস্ক উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যু ঝুঁকি কম। যা গড়ে ২ থেকে ৩ শতাংশ। অপরদিকে মার্স ভাইরাসে মৃতুর হার ৩৪ এবং সার্স ভাইরাসে মৃতুর হার ৯.৬ শতাংশ।

এছাড়া করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত্ত ও মৃত্যর ক্ষেত্রে বয়স একটি কারণ হিসেবে কাজ করে। ৮০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সিদের আক্রান্তের হার ২১.৯ শতাংশ এবং মৃতু হার ১৪.৮ শতাংশ। ৭০-৭৯ বছর বয়সিদের মৃত্যুর হার ৮ শতাংশ।

৬০-৬৯ বছর বয়সিদের মৃত্যুর হার ৩.৬ ও ৫০-৫৯ বছর বয়সিদের মৃত্যুর হার ১.৩ শতাংশ। ৪০-৪৯ বছর বয়সিদের মৃত্যুর হার ০.৪ ও ২০-৩৯ বছর বয়সিদের মৃত্যুর হার ০.২ শতাংশ।

বয়স্করা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে বার্ধক্যজনিত নানা রোগের কারণে তাদের সংক্রামণ প্রকট হচ্ছে। কিশোর-যুবক থেকে মধ্য বয়সিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় আক্রান্ত হলেও নিরাময় লাভ করছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাস সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে মোবাইল ফোন, প্রিন্ট ও মিডিয়ায় প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি করা। এবং নেতিবাচন প্রচারণার মাধ্যমে মানুষ যেন আতঙ্কিত না হয় সে ব্যাপারে সচেতন থাকা। মার্স ও সার্স ভাইরাস অপেক্ষা করোনা ভাইরাস তুলনামূলক কম বিপদজনক এবং মৃত্যুর হারও কম।

বিষয়টি মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং সচেতনা বৃদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ করা। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও স্বার্থান্বেষী মহল দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং সরকারের প্রতি গণমানুষের আস্থা বিনষ্টের চেষ্টায় সোস্যাল মিডিয়ায় সাধারণ মৃত্যুকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

এ বিষয়ে নজরদারিপূর্বক দোষীকে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। গার্মেন্ট কারখানাসহ শ্রমঘন কল-কারখানা এলাকায় প্রতিদিনই সচেতনামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। অফিস আদালত, বাসা-বাড়িতে সমষ্টিগতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

গার্মেন্টে বেতনভাতা পরিশোধে এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। দেশের সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে কোয়ারেন্টাইন বেড প্রস্তুত রাখা এবং ফোকাস পয়েন্ট নির্ধারণ করে মোবাইল ফোন নাম্বার প্রচার করতে হবে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে পীরের দরবার ও মাজারগুলোতে বার্ষিক ওরশ অনুষ্ঠানে অধিক লোক সমাগম হয়, এমন অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি না দেয়া, দেশের সকল বন্দরের চেকপোস্টে ভাইরাস পরীক্ষা কার্যক্রম নিবিড় ও জোড়দারের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা, জুমার নামাজে খুৎবার আগে বয়ানে করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়সমূহ সম্পর্কে ইমামদের নির্দেশনা দিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া এবং করোনা ভাইরাস ইস্যুতে যেসব অসাধু ব্যবসায়ী মাস্ক, হ্যান্ডওয়াস, স্যানিটাইজার, টিস্যু পেপার ও থার্মোমিটার অস্বাভাবিক মূল্যে বিক্রি করছে তাদের আইনের আওতায় আনতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা আরও জোরদার করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

বড় ধরনের অসন্তোষে আশঙ্কা পাওয়া গেলো বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হকের দেয়া তথ্যেও। বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বলেন, ভয়াবহ অবস্থা চলছে আমাদের।

বিভিন্ন দেশ, মহাদেশ থেকে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করছে। ১ হাজার ৮৯টি কারখানায় এ পর্যন্ত ১২ হাজার কোটি টাকার অর্ডার বাতিল করা হয়েছে। এসব কারখানা প্রায় ১২ লাখ শ্রমিক কাজ করেন।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ