সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

জাহাঙ্গীর আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০১,২০২০, ০২:৩২

এপ্রিল ০১,২০২০, ০২:৩২

ঝুঁকিতে গ্রামীণ অর্থনীতি

  • করোনা অজুহাতে বন্ধ রয়েছে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান
  • মোকাম থেকে আসছে না চালসহ নিত্যপণ্য

আগের চেয়ে চালের দাম কমে গেছে। মান ভেদে ৪০-৫৫ টাকা কেজি। মোকাম থেকে এলে আরও দাম কমবে। ট্রাক ড্রাইভাররা রাজি না হওয়ায় মিল থেকে চাল ঢাকায় আসছে না।

লাউ ৪০ টাকা পিস, পটল, বেগুন, পেঁয়াজের কেজি ৪০ টাকা। অন্যান্য সবজিও কম দাম। ডিমের ডজন ৯০ টাকার নিচে নেমে গেছে। তাও বিক্রি হচ্ছে না।

গতকাল রাজধানীর বড় পাইকারি বাজার কৃষি মার্কেটসহ অন্যান্য বাজার ঘুরে এ বাস্তব চিত্র পাওয়া গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, করোনায় গণপরিবহন বন্ধ হলেও ট্রাক, কাভার্ডভ্যান কোনো বাধা নেই।

তারপরও ঢাকায় ট্রাকসহ অন্যান্য পরিবহন আসতে রাজি না হওয়ায় পণ্য আসছে না। এতে ভোক্তাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। অপরদিকে কৃষকদেরও লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই কৃষিপণ্য সরবরাহে সরকারকে নজর দিতে হবে। তা না হলে কৃষকরা পথের ফকির হয়ে যাবে। চরম ঝুঁকিতে পড়বে গ্রামের অর্থনীতি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার প্রকোপ ঠেকাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পণ্য পরিবহন করা দরকার। কারণ মানুষকে খেতে হবে। কৃষকদেরও বাঁচতে হবে। তারা আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তারা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে বাংলাদেশকে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, করোনার প্রভাব মোকাবিলায় যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী খাদ্যপণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর। সব পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে মাঠ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করে যাচ্ছে।

এর জন্য যা যা করা প্রয়োজন, সরকার তাই করবে। এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। এ জন্য গণপরিবহন বন্ধ রাখলেও খাদ্যপণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। তারপরও মালিক, শ্রমিকরা তা মানছে না। এ জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাল, ডাল, সবজিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য রাজধানীতে আসতে পারছে না।

একইভাবে রাজধানী থেকে জরুরিভিত্তিতে খাদ্যপণ্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠানো যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিকরা বলছেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে চলমান পরিস্থিতিতে অনেক চালক ও হেলপার বাড়ি চলে গেছেন। অনেকেই জানের ভয়ে রাস্তায় নামতে চাইছেন না। আবার সারা দেশে খাবার হোটেলও বন্ধ রয়েছে।

অপরদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভিন্ন কথা। মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের সাপলা রাইস এজেন্সির মঈন উদ্দিন আমার সংবাদকে বলেন, ভাই দোকান বন্ধ করে দিয়েছি। একদিকে ক্রেতা নেই।

অন্যদিকে মোকাম থেকে চাল আসছে না। দেশে চালের অভাব নেই। কিন্তু করোনার কারণে নওগাঁ ও কুষ্টিয়া থেকে চাল আসতে পারছে না। ট্রাক মালিকরা চাল নিয়ে আসছে না। তারা এলে আরও কম দামে চাল বিক্রি করা যেত।
বর্তমানে ৪০-৫৫ টাকা কেজি মানভেদে চাল বিক্রি করা হচ্ছে।

তার কথার সত্যতা চাচাই করতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ অটো মিল মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও রশিদ রাইস মিলের মালিক এ প্রতিবেদককে জানান, করোনা ভাইরাসের থাবায় আতঙ্কিত মানুষ। বেশিরভাগ মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে এসেছে। ঢাকায় মানুষ না থাকায় চালের চাহিদাও কমে গেছে।

আর চাহিদা না থাকায় দামও কমে গেছে। ট্রাক আগের মতো ঢাকায় যাচ্ছে না। কিন্তু মিলতো বন্ধ রাখা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে অনেক লোকসানে পড়তে হবে। তা নিয়ে ভাবা দরকার। কারণ ট্রাক, কার্ভাডভ্যান চলাচলে কোনো বাধা দেয়নি সরকার।

কৃষি মার্কেটের মুন্সীগঞ্জ বাণিজ্যালয়ের আ. রউফ বলেন, পাইকারি দেশি পেঁয়াজ ৩৫ টাকা, বাইরেরটা ৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। বাইরে ওইসব পণ্য ৫ টাকা বেশি দরে খুচরা বিক্রি হতে দেখা যায়।

বরিশাল পোল্ট্রির জামান বলেন, ৯০ টাকা ডজন ডিম। নেন, একটু দাম কম রাখব। তিনি আরও বলেন, মোকাম থেকে বর্তমানে আসছে না। আগে ১২০ টাকা ডজন বিক্রি করা হলেও বর্তমানে ৯০ টাকার নিচে দাম। তারপরও বিক্রি হচ্ছে না।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের বিআরটিসির অনেক ট্রাক রয়েছে। এসব ট্রাকের চালকরা সরকারি কর্মচারী। তাই এমন পরিস্থিতিতে বিআরটিসির ট্রাকগুলো রাস্তায় নামানো হলে জরুরি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন অনেকটাই সম্ভব বলে জানান।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সরকারের অর্থনীতির থিংকার পরিকল্পনা কমিশনের জিইডি সদস্য (সিনিয়র সচিব) অধ্যাপক ড. শামসুল আলম এ ব্যাপারে আমার সংবাদকে বলেন, গণপরিবহন বন্ধ করা হলেও পণ্য পরিবহনে কোনো বাধা দেয়নি সরকার। নিত্যপণ্যের জন্য ট্রাক, কার্ভাডভ্যান মুক্ত রাখা হয়েছে।

কারণ মানুষকে খেতে হবে। না খেয়ে বাঁচতে পারে না। করোনা ভয়ে অনেকেই নিত্যপণ্য কিনলেও চাহিদা একেবারে কমে যায়নি। হয়তো একটু কমে গেছে। তাই বলে ট্রাক মালিক, শ্রমিকরা পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দেবে তা ঠিক না। অন্যান্য ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হচ্ছে।

তাই স্বাস্থ্যবিধি বা শিষ্টাচার মেনেই পণ্য পরিবহন করা দরকার মালিক-শ্রমিকদের। তা না হলে কৃষকরা বাঁচতে পারবে না। অপরদিকে ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলে কোনো বাধা নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে সবাই জানে বাঁচতে চাই। এ জন্য করোনার ভয়ে হয়তো অনেকেই রাস্তায় যাচ্ছে না। কেউ গাড়ি না নামালে করার কিছু নেই। জোর করে নামানো যাবে না।

তারপরও যেহেতু অভিযোগ পেলাম, দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে সমিতির পক্ষ থেকে পণ্য পরিবহনে চিঠি দেয়া হবে। যাতে রাজধানীতে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক সংকট না হয়।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ