সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

নুর মোহাম্মদ মিঠু

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০১,২০২০, ০২:৫০

এপ্রিল ০১,২০২০, ০২:৫০

মিলছে না মৌসুমী রোগের চিকিৎসা

করোনা ভাইরাসের যেসব লক্ষণের কথা বলা হচ্ছে— সর্দি-কাশি, হাঁপানি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া বাংলাদেশে সব সময়ই ছিলো। এসব উপসর্গ করোনা ভাইরাসের কারণে নাকি সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি বা শ্বাসকষ্ট, তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষা জরুরি।

কিন্তু বর্তমান সময়ে অধিকাংশ হাসপাতালেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পারসোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) ব্যবস্থা না থাকায় তারা এ ধরনের রোগীদের গ্রহণই করছেন না। ফলে স্বাস্থ্যসেবাপ্রার্থীরা পড়ছেন আরেক মহাসংকটে।

সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা আলমাছ উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এর আগেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

তবে বিলম্বে হলেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের পরীক্ষা ও চিকিৎসার বিষয়ে তৎপরতা কিছুটা বাড়লেও করোনা চিকিৎসার প্রাথমিক স্তর পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিট, আইসিইউর যন্ত্রপাতি এবং সামগ্রিকভাবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দরকারি পার্সোনাল প্রোটেকশন ইক্যুইপমেন্ট বা পিপিই সরবরাহের ক্ষেত্রে এখনো যথেষ্ট ঘাটতি রয়ে গেছে।

এ কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। তাদের এই নিরাপত্তাহীনতা এতটাই প্রকট যে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নন, এমন রোগীরাও হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। চিকিৎসাসেবাপ্রার্থীদের কজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এমনটাই।

কুমিল্লার এক রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল দুপুরে জেলা সদর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকই পাওয়া যায়নি সেখানে। জরুরি সেবা গ্রহণের বিষয়টি তো পরের কথা।

ওই স্বজন জানান, কিছুদিন আগে তার রোগীর মাথায় অপারেশন করা হয়েছিল। কিন্তু গতকাল হঠাৎ মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলে সদর হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চান তারা। অথচ চিকিৎসকই না থাকায় রোগী নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় তাকে।

নাম প্রকাশ না করে আরেক রোগী জানায়, কিছুদিন আগে ঢাকার একটি হাসপাতালে বায়োফসি করা হয় তার। হঠাৎ বায়োফসির স্থান থেকে রক্তপাত হওয়ায় কুমিল্লা সদর হাসপাতালে যান তিনি। কিন্তু চিকিৎসক সংকটে সেখানে চিকিৎসা করাতে পারেননি তিনি। এ বিষয়ে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে যোগাযোগ করেও কারো সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এদিকে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা আলমাছ উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত হূদয়বিদারক বলে বলছেন অনেকেই। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ার পর স্বজনরা তাকে একে একে ছয়টি হাসপাতালে নিয়েও চিকিৎসা করাতে পারেননি।

নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার লক্ষণ থাকায় কোনো হাসপাতালই তাকে ভর্তি করতে রাজি হয়নি। আবার কোনো হাসপাতাল ভর্তি করলেও চিকিৎসকরা সেবা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

ফলে বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি। এর আগে ঢামেকে কানাডাফেরত নাজনীন আমিন ও খুমেকে মৌসুমী জ্বর-সর্দি নিয়ে ভর্তি হওয়া বাবুল চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনা ছাড়াও সারা দেশে করোনা আতঙ্কে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে এ রকম অসংখ্য রোগীকে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছেই। ঘটেছে প্রাণ নিয়ে হাসপাতালে এসে প্রাণহীন ফিরে যাওয়ার ঘটনাও।

এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডা. রশিদ-ই-মাহবুবের কাছে জানতে চাইলে আমার সংবাদকে তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। আর প্রাইভেটগুলোতে চিকিৎসকরা সাধারণত জরুরি চিকিৎসাসেবা দেন না। যে কারণে করোনা আক্রান্ত ছাড়াও অন্যান্য উপসর্গীয় রোগ নিয়ে সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালগুলোতে যাচ্ছেন।

কিন্তু বর্তমান সময়ে করোনা সংকটের মধ্যে সরকারি চিকিৎসকদের পিপিইর ঘাটতি থাকায় তাদের মধ্যেও এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। সরকার এদিকে জোরালো ভূমিকা না রাখলে চিকিৎসা সেবাবঞ্চিত হবে সাধারণ মানুষ। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ ঘাটতি পূরণের কথা বলা হচ্ছে।

সরকারের কথায় আমরাও আশা করছি আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে চিকিৎসকদের পিপিই সংকটের সমাধান হবে। আর এরই মধ্য দিয়ে সমাধান হবে সাধারণ মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সংকটও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাু সংকট একটা বিশেষ পরিস্থিতি। সেটা সামাল দেয়ার চেষ্টা চলছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই পরিস্থিতিতে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। করোনা সংক্রমণ ছাড়াও লোকজন নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং তার জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবারও প্রয়োজন পড়ছে। বিষয়টি আগেই বিবেচনায় না নেয়ায় এবং এ সংক্রান্ত গাইডলাইন ঠিক না করায় জরুরি চিকিৎসাসেবা পরিস্থিতি অনেকটাই শোচনীয় হয়ে পড়েছে।

বর্তমান জরুরি এই পরিস্থিতিতে প্রতিদিন হাজার হাজার সাধারণ রোগী স্বাস্থ্যসেবা নিতে বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছেন, তাদের চিকিৎসার বিষয়টিকে কোনোভাবেই হেলাফেলার সুযোগ নেই।

কিন্তু এটি চরমভাবে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও নির্দেশনার অভাবও দেখা যাচ্ছে। হাসপাতাল ফিরিয়ে দিলে রোগীরা যাবে কোথায়— এমন প্রশ্নও সংশ্লিষ্ট মহলে।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে এ সমস্যার সমাধানের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর জন্য এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করে দিতে হবে।

এই গাইডলাইন ও নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে মানতে বাধ্য করতে হবে। কেউ নির্দেশনা না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পিপিই সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে ও তারা অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ব্যস্ত থাকায় কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ