সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০১,২০২০, ০২:৫৮

এপ্রিল ০১,২০২০, ০২:৫৮

নবীন আইনজীবীদের দেখার কেউ নেই!

করোনা ভাইরাস। মহামারি ভাইরাসটির কারণে স্থবির হয়ে গেছে পুরো বিশ্ব। বন্ধ রয়েছে সকল সরকারি ও বেসরকারি অফিসও।বাংলাদেশেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।

বৈশ্বিক মহামারিতে পরিণত হওয়া করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে দেশের বিচার বিভাগের ওপরও। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে বন্ধ রয়েছে আদালত অঙ্গনও।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কবে সেটাও বুঝে ওঠা সময়সাপেক্ষ। স্বাভাবিক হলেও সামনে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা আছে সে বিষয়টিও পরিষ্কার। দেশের সব খাতে করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়ার সাথে এর প্রভাব পড়েছে সুপ্রিম কোর্টের নবীন আইনজীবীদের মাঝেও।

এমন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যে একরকম হতাশা বিরাজ করছে। এর অন্যতম কারণ হলো নবীন আইজীবীরা প্রতিমাসে যা আয় করেন সেটা তাদের মাসিক খরচ চালাতেই ফুরিয়ে যায়।

অথচ এখন আদালত বন্ধ থাকায় তাদের আয়ের উৎসও বন্ধ হয়ে গেছে। অবস্থার উন্নতি না হলে অচিরেই মানবেতর জীবন কাটাতে হতে পারে এসব শিক্ষানবীস বা নবীন আইনজীবীদের।

অপরদিকে মর্যাদার ভয়ে কারো কাছে সাহায্যের হাত বাড়াতেও অস্বস্তি বোধ করছেন নবীনরা। ফলে এমন পরিস্থিতিতে আইনজীবীরা তাকিয়ে আছেন আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এবং আইনজীবী সমিতির দিকে।

এ নিয়ে কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা মতামত ব্যক্ত করেন। কেউ কেউ আবার পরামর্শ দিচ্ছেন এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বারের নবনির্বাচিত সদস্যরাও আশ্বাসের বানীও শুনাচ্ছেন।

এদিকে প্রাণঘাতী করোনা মোকাবিলায় সরকারকে সহায়তায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিল্লির সিনিয়র আইনজীবীরা আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। এমন অবস্থায় দেশের সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীরা কবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবেন এমন প্রশ্নও তুলেছেন নেটিজেনরা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ বলছেন এবার সুপ্রিম কোর্টের গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে যেসব সিনিয়র আইনজীবী অবকাশ যাপনে বিদেশ ভ্রমণে যেতে পারেননি তাদের সেই টাকা দিলেই কয়েক কোটি টাকা হবে। যে টাকা দিয়ে আর্থিক অসচ্ছলদের সহায়তা সম্ভব। খুব শিগগিরই তারা এ ঘোষণা দেবেন এমন আশার কথাও জানান নেটিজেনরা।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, নবীনরাই হচ্ছে হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের প্রাণভোমরা তাই তাদের খারাপ সময়ে বারের পক্ষ থেকে এগিয়ে আসা অতি জরুরি। জুনিয়রদের আয়ের উৎস কোর্ট, করোনার কারণে সেটা বন্ধ রয়েছে কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে সেটাও নিশ্চিত নয়।

তাই এ অবস্থায় তাদের তালিকা করে আর্থিক সহায়তার দাবি জানান এসব আইনজীবী। জুনিয়রদের সাহায্যের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীর মতামত, পরামর্শ ও আশ্বাস নিচে তুলে ধরা হলো—

অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল কুদ্দুস বাদল
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আব্দুল কুদ্দুস বাদল কিছুটা ক্ষোভের সুরেই বলছেন, ‘সরকারের রাজস্ব আদায়ের অন্যতম খাত স্ট্যাম্পসহ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফি (মামলা পরিচালনার বিভিন্ন সময়ে) সরকারি কোষাগারে জমা হয়।

বিচারক, কোর্ট কর্মকর্তা ও স্টাফদের যাবতীয় খরচ সরকার বহন করলেও রাজস্ব আদায়ের মুখ্য ভূমিকা পালনকারী বিজ্ঞ আইনজীবীদের জন্য এতে কোনো বরাদ্দ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই সময়ে বিভিন্ন পেশার নাগরিকদের বিশেষ বরাদ্দ দিচ্ছেন।

আইনজীবীদের নেতা হয়ে বেশির ভাগই নিজেদের ভাগ্যান্নোয়নে কাজ করলেও আইনজীবীদের স্বার্থে সরকারের নিকট থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ-সুবিধা আদায় করেছেন এমন নজির চোখে পড়ছে না।

বিজ্ঞ আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। প্রায় ৬০ হাজার বিজ্ঞ আইনজীবী প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা বাৎসরিক ফি, ভেনাভোলেন্ট ফান্ড বার কাউন্সিলের একাউন্টে জমা করেন।

স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবে এই মুহূর্তে বার কাউন্সিল আইনজীবীবান্ধব প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারেন। যদিও বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পদে অনির্বাচিত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের এ বিষয়ে মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু যারা নির্বাচিত ইচ্ছা করলে তারা কিছু করতে পারেন।’

অ্যাডভোকেট ওবায়েদ আহমেদ রুমন
সুপ্রিম কোর্টের নবীন আইনজীবী ওবায়েদ আহমেদ রুমন বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি পরিবর্তন না হলে আরও অনেকদিন আমাদের কর্মহীন থাকতে হবে। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে বেশ সময় লাগবে বলে মনে হচ্ছে।

আর দীর্ঘদিন আদালত বন্ধ থাকলে আমাদের অবস্থা কি হয় তা আমাদের মতন নবীন আইনজীবীরা সবাই জানেন, প্রতিবছর ডিসেম্বরের ভেকেশন শেষে কোর্ট ওপেন হওয়ার পরও দীর্ঘ একটা সময় চলে যায় আয় রোজগার স্বাভাবিক হতে, আর এবারের এই করোনা পরিস্থিতি হয়তো আরও ভয়াবহ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে, এরকম পরিস্থিতিতে বরাবরই আমরা জুনিয়র আইনজীবীরা ভুক্তভোগী হয়ে থাকি।

তাছাড়া সকল সিনিয়ররা জুনিয়র-বান্ধব নন সেক্ষেত্রে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে গিয়ে অনেকেই হিমশিম খাবেন, আমাদের আইনজীবী বন্ধুদের মধ্যে যাদের আয় রোজগার কম কিংবা আয় ভালো হলেও যাদের জমানো তেমন কিছু নাই কিংবা যাদের জমানো থাকলেও এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই তা ফুরিয়ে যাচ্ছে কিংবা যারা একেবারে জুনিয়র তাদের আসন্ন দুর্দশা মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে কিংবা আমাদের সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে একটি তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

বর্তমান কমিটি দ্রুত একটি জরুরি তহবিল গঠন করে তা থেকে প্র্যাকটিসিং ল’ইয়ারদের আপদকালীন বরাদ্দ না দিলে বিজ্ঞ আইনজীবীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে নিদারুণ কষ্টে পড়ে যাবেন, এহেন পরিস্থিতিতে পেশাগত মান ইজ্জতের কথা চিন্তা করে খুব সিরিয়াসলি বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে বিজ্ঞ আইনজীবীরা যেনো সর্বদা সমাজে মর্যাদা নিয়ে চলতে পারে সে লক্ষ্যে পেশাগত মানোন্নয়ন অত্যাবশ্যক।’

অ্যাডভোকেট মো. আনোয়ার হোসেন
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ঢাকা কর আইনজীবী সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরে বলেন, ‘শ্রদ্ধেয় সভাপতি ও সম্পাদক, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা ট্যাকসেস বার অ্যাসোসিয়েশন ও অন্যান্য বার অ্যাসোসিয়েশন, অত্যন্ত বিনয়ের সহিত প্রস্তাব করছি যে,
১। বারের আয়ের একটি অংশ (ওকালতনামা, বেইল বন্ড ও সুদ আয় ইত্যাদি ) (৫-১০) ভাগ বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি বছর ওয়েলফেয়ার ফান্ড/জরুরি ফান্ডে জমা রাখলে বিপদে আপদে সকল আইনজীবীদের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

২। বারের আয়ের একটি অংশ (৫-১০) ভাগ বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি বছর মেডিকেল ফান্ডে জমা রাখলে বিপদে আপদে সকল আইনজীবীদের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

৩। সলভেন্ট আইনজীবীরা ইলেকশনে কোটি কোটি টাকা খরচ না করে বারের ফান্ডে অনুদান প্রদান করলে জুনিয়র আইনজীবীরা উপকৃত হতো’।

ব্যারিস্টার কাজী শামসুল হাসান শুভ
কিছুটা আশ্বাসের সুরে বক্তব্য রেখেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কার্যকরী কমিটির সিনিয়র সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার কাজী শামসুল হাসান শুভ।

তিনি বলেন, ‘এই সময়ে আইনজীবীদের পাশে থাকা আমিও জরুরি মনে করছি। সমিতির সন্মানিত সভাপতির সাথে কথা হয়েছে। কার্যকরী কমিটির বাকি সদস্যদের সাথে আলাপের চেষ্টা করছি।

এই লক ডাউন পরিস্থিতিতে সমিতির নিয়মনীতির মধ্যে থেকে বাস্তবসম্মতভাবে কিভাবে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে নবীন আইনজীবীদের পাশে থাকা যায় তা নিয়ে উপায় খুঁজছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি এ এম এন আমিন উদ্দিন আমার সংবাদকে বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আপাতত প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে সহায়তা করার মতো অবস্থা বারের নেই।

তবে সুপ্রিম কোর্টে যারা নবীব আইনজীবী রয়েছে, যাদের উপার্জন একবারে কম তাদের কিছু অর্থ সাহায্য দেয়ার জন্য বারের পক্ষ থেকে একটা তহবিল গঠনের চেষ্টা করছি।

কারণ এদের সহায়তা করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট বার ছাড়া অন্য কেউ নেই। তাই এমন পরিস্থিতিতে এদেরই বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এখনো জানি না এসব জুনিয়রদের জন্যই কতটুকু করতে পারবো। তবে ভালো কিছু করার জন্য চেষ্টা করছি।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ