বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০

২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

রাসেল মাহমুদ

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৭,২০২০, ০২:৪৮

এপ্রিল ০৭,২০২০, ০২:৪৮

অনিশ্চয়তায় বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষকরা

করোনা ভাইরাসের কারণে বন্ধ রয়েছে দেশের সরকারি-বেসরকারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। করোনা মোকাবিলায় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঘরে থাকতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেতন পেলেও বরাবরের মতোই আর্থিক সুবিধাবঞ্চিত থেকে যাবে জাতীয়করণ থেকে বাদপড়া চার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক।

বিনা বেতনে শিক্ষকতা করলেও জীবিকা নির্বাহের জন্য এসব শিক্ষকরা খণ্ডকালীন কাজ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, টিউশন, কৃষি কাজসহ বিভিন্ন কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। চলমান পরিস্থিতিতে এসব কাজও বন্ধ রয়েছে।

ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের আবেদন জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে গতকাল সোমবার এ আবেদন করা হয়। সংগঠনটির সভাপতি মো. মামুনুর রশিদ খোকন আমার সংবাদকে মুঠোফোনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছি। জীবিকার জন্য অন্য কাজ করতে হতো। করোনার কারণে এখন তাও বন্ধ রয়েছে।

এ অবস্থায় সরকার প্রধান আমাদের প্রতি সদয় না হলে স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা ভাই-বোন নিয়ে অনাহারে থাকতে হবে।তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমরা বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের আবেদন জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, আমরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বরাবর স্মারকলিপির মাধ্যমে আবেদন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে অফিস বন্ধ থাকায় আমরা খোলা চিঠির মাধ্যমে এ আবেদন জানিয়েছি।

এদিকে, শিক্ষকদের খোলা চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলা হয়, ‘আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, ১৯৭৩ সালের পহেলা জুলাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত জাতিকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে দেশকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করার জন্য তার এক ঘোষণায় প্রথমত ৩২ হাজার এবং পরবর্তীতে আরও চার হাজার ১৬০টিসহ মোট ৩৬ হাজার ১৬০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ ও কর্মরত শিক্ষকদের চাকরি সরকারিকরণ করেন। জাতি গঠনের নিপুণ কারিগর, প্রাথমিক বিদ্যলয়ের শিক্ষকদের অভিভাবক হয়ে হূদয়ে চির স্মরনীয় হয়ে আছেন তিনি।’

প্রায় ৪০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আপনি যখন আধুনিক বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হাতে নিয়েছেন, বাঙালি জাতির শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়ে জাতির পিতার মতো আরও একটি ইতিহাস রচনা করেছেন।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, জাতীয়করণকালীন ২৬ হহাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান করা হয়েছিল, তার সংখ্যা যথাযথ না হওয়ায় রেজিস্ট্রার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩৪টি, অস্থায়ী রেজি. বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২৮৬টি, নন রেজি. বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩৩৩২টি এবং মাদার স্কুলের নামে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৫০৭টি সহ মোট চার হাজার ১৫৯টি বিদ্যালয় ও কর্মরত শিক্ষকরা জাতীয়করণ হতে বঞ্চিত হয়।

২০১২ সালের সমাপনীসহ এই বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে থেকে প্রায় ১৩০০ বিদ্যালয় জাতীয়করণের জন্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। যা মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত আছে।

খোলা চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘গত বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ ১৮ দিন অনশন পালনের পর আপনার সুদৃষ্টি কামনা করা হলে আপনার কার্যালয় থেকে তালিকা বহির্ভূত প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে জাতীয়করণে হালনাগাদ তথ্য চাওয়া হয়।

তখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মহোদয় সঠিক তথ্য না দেয়ায় আবারো বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়ে যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবারো আপনার সুদৃষ্টি কামনার জন্য গত বছরের ১৬ জুন থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৫ দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশনের মতো কর্মসূচি করি।

সে কর্মসূচি পালনের সময় ডেঙ্গুজ্বরে একজন শিক্ষক মৃত্যু বরণও করেন। বেতন-ভাতা না থাকায় জীবনযাপনের জন্য অনেক শিক্ষক বিকালে খণ্ডকালীন কাজ করে। কেউবা বাসাবাড়িতে টিউশনি করে, কেউ হোটেলে কাজ করে, কেউ ইজিবাইক চালিয়ে জীবনযাপন করেন।

বর্তমানে সারা বিশ্বে কোভিড-১৯ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। বড় আশার কথা হলো, আপনার হস্তক্ষেপে ও ৩১টি নির্দেশনার মাধ্যমে বর্তমানে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আছে।

আপনার নির্দেশনা দেশবাসী যেমন মেনে চলছে, তেমনি বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষকরাও আপনার নির্দেশনা মেনে চলছে এবং সংগঠন থেকে মেনে চলার আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো বেসরকারি শিক্ষকরা কোনো বেতন-ভাতা পায় না।

এমতাবস্থায় আপনার নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হোম কোয়ারেন্টাইন থাকায় অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকার খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।

তাই প্রয়োজনে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে অথবা সংগঠনের মাধ্যমে এই অসহায় শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আপনার তহবিল থেকে আর্থিক প্রণোদনাসহ পরবর্তীতে জাতীয়করণের জন্য আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

চিঠির বিষয়ে বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মহাসচিব আ স ম জাফর ইকবাল বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে প্রধানমন্ত্রী আমাদের দায়িত্ব না নিলে আমাদের কষ্টের সীমা থাকবে না।

তাই আমাদের শেষ আশ্রয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠির মাধ্যমে আবেদন করেছি। আমরা আশা করছি তিনি আমাদের প্রতি সুনজর দেবেন।’

আমারসংবাদ/এসটিএমএ