মঙ্গলবার ০২ জুন ২০২০

১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

আসাদুজ্জামান আজম

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৮,২০২০, ০২:২০

এপ্রিল ০৮,২০২০, ০২:২০

মাজেদের সাজা দ্রুত কার্যকর চায় আ.লীগ

সদ্য স্বাধীন দেশের অসহায় মানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে একের পর যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

কিন্তু পাকিস্তানিদের দেশি দোসরদের হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর দীর্ঘসময় ইনডেমনিটি জারি করে জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করা হয়েছিল, শুধু বিচার বন্ধ নয়, খুনিদের করা হয়েছিল পুরস্কৃত।

১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতা আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা আসার ফের বিচারকাজ সম্পন্ন হয়। সর্বোচ্চ সাজা হয় খুনিদের।

নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে স্বাধীনতার স্বপ্ন যারা লুষ্ঠিত করতে চেয়েছিল, তাদের একজন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর খুনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ’কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকা মাজেদকে ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয়।

দুপুরে ফৌজদারি কার্যবিধি ৫৪ ধারায় তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। পরে ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।

২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তারা হলেন— লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি) ও লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার)।

এখনো পলাতক আছেন, কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ, লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল এএম রাশেদ চৌধুরী, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, লে. কর্নেল এসএইচ নূর চৌধুরী।

চলতি বছর বাংলাদেশের মহান স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী সাল। সেই হিসাবে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত মুজিববর্ষ পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে মরণঘাতক করোনা ভাইরানের কারণে জনসমাগম এগিয়ে মুজিববর্ষের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। জাতির জনকের জন্মশত বাষির্কীতে আরেক খুনি ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ গ্রেপ্তার হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপেক্ষর শক্তির সাধারণ মানুষ।

এটিকে মুজিব বর্ষের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদের রায় দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর দেখতে চান তারা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, বর্তমান সরকার এবং সরকারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমি অভিনন্দন জানাই। তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে তার খুনিকে গ্রেপ্তার করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর এই খুনির যে দণ্ড আদেশ তা অতি দূরুত্ব কার্যক্রর করার জন্য সরকারের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানাই। এটাই আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মীর প্রাণের দাবি।

আওয়ামী লীগের অন্যতম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, বঙ্গবন্ধু খুনিদের শাস্তি কার্যকর আমাদের প্রাণের দাবি। আমরা চাই- বঙ্গবন্ধু আত্মস্বীকৃত খুনিদের শাস্তি অনতিবিলম্বে হোক এটা শুধু দাবি নয়, আমাদের আকাঙ্খা ও স্বপ্ন।

আইনের শাসন শক্তিশালী করার জন্য অপরিহার্য্য। খুনি মাজেদ গ্রেপ্তারে প্রমাণ হলো- খুনিদের রেহাই নেই, বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক, শাস্তি কার্যকর হবেই হবে।

বঙ্গবন্ধু হত্যামামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মাজেদের গ্রেপ্তার দেশবাসীর জন্য মুজিববর্ষের শ্রেষ্ঠ উপহার বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

মন্ত্রী বলেন, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সময় এই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ এবং নূর ও রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন— এই তিনজন সেখানে ছিলেন।

আরও কয়েকজন ছিলেন। এই খুনি শুধু বঙ্গবন্ধুর খুনে অংশগ্রহণ করেননি। তিনি জেলহত্যায়ও অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে আমাদের জানা রয়েছে। খুনের পরে তিনি জিয়াউর রহমানের নির্দেশ মোতাবেক বঙ্গভবনে এবং অন্যান্য জায়গায় কাজ করেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আশা করি আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা তার দণ্ডাদেশ কার্যকর করতে পারব। যারা এই কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের ধন্যবাদ দিয়ে আমি মনে করি, মুজিববর্ষের একটা শ্রেষ্ঠ উপহার আমরা দেশবাসীকে দিতে পেরেছি।

তৎকালীন জিয়াউর রহমান সরকার বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের বদলে তাদের নানাভাবে পুরস্কৃত করেছে এবং ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে তাদের যাতে বিচার না হয় সেই ব্যবস্থাটি পাকাপোক্ত করেছে।

বঙ্গবন্ধু আত্মস্বীকৃত খুনি ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদের শাস্তি কার্যকরের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল বলেন, শুধু আওয়ামী পরিবারের নয়, সারা দেশের মানুষ চায় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সাজা কার্যকর করা হোক। মুজিব শতবর্ষে একজন খুনি গ্রেপ্তার আনন্দের বিষয়, আমরা অতি দ্রুত শাস্তি কার্যকর দাবি জানাই।

আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ বলেন, খুনি আবদুল মাজেদ গ্রেপ্তার হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দ্রুত কার্যকরের দাবি জানাই।

আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আজগর নস্কর বলেন, বঙ্গবন্ধুর পলাতক প্রতিটি খুনির শাস্তি কার্যকর আমরা চাই। খুনি মাজেদকে দ্রুত সময়ের মধ্যে দণ্ড কার্যকর করে, জাতিকে আরেক ধাপ কলঙ্কমুক্ত করা হোক।

কে এই ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বাটামারা গ্রামের মরহুম আলী মিয়া চৌধুরীর ছেলে ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ। ১৯৭৫ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি অন্য আসামিদের সঙ্গে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। হত্যাকাণ্ড শেষে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার অপর আসামি মেজর শাহরিয়ারসহ অন্য সেনা সদস্যদের সঙ্গে রেডিও স্টেশনে দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়া তিনি ক্যুকৃত অফিসারদের সঙ্গে বঙ্গভবনে দেশ ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী অফিসারদের সঙ্গে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের আদর্শে বাংলাদেশ থেকে ব্যাংকক হয়ে লিবিয়া গমন করেন।

তিনি সেখানে ক্যুকৃত অফিসারদের সঙ্গে তিন মাস অবস্থান করেন। অবস্থানকালীন হত্যাকাণ্ডের পুরস্কার হিসেবে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান তাকে সেনেগাল দূতাবাসে বদলির আদেশ দেন।

পরে ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান সরকার ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদকে বিআইডব্লিউটিসিতে চাকরি দেন এবং উপসচিব পদে যোগদানের সুবিধার্থে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে তিনি অংশগ্রহণ করেন। পরে তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।

এরপর তিনি মিনিস্ট্রি অব ইয়ুথ ডেভেলপমেন্টে ডাইরেক্টর ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট পদের জন্য আবেদন করেন এবং ওই পদে যোগদান করেন।

সেখান থেকে তিনি ডাইরেক্টর অব হেড অব ন্যাশনাল সেভিংস ডিপার্টমেন্টে বদলি হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য শুরু করলে তিনি আটক হওয়ার ভয়ে আত্মগোপন করেন।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ