মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

১৩ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

আবদুর রহিম ও রফিকুল ইসলাম

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ১৪,২০২০, ১০:২০

সেপ্টেম্বর ১৪,২০২০, ১০:৫৭

পুরনো চেহারায় রাজনীতি

পুরনো চেহারায় ফিরছে বাংলাদেশের রাজনীতি। দীর্ঘ পাঁচ মাস হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা রাজকর্মসূচি ভার্চুয়াল মাধ্যমে মাঠে আসছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত মাঠ চাঙ্গা করার পরিকল্পনা নিয়েছে দেশের সব রাজনৈতিক দল। ভোটের মাঠেও থাকছে।

এ জন্য ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দল, বিএনপি, বিরোধী দল- জাতীয় পার্টি,  ঐক্যফ্রন্ট, বাম দল, ইসলামী দলগুলোসহ সবাই টিকে থাকা ও দলীয় অবস্থানের পরিকল্পনা গ্রহণ করে দলে বার্তা দিয়েছে। হাইকমান্ড থেকে সব দলেই দেয়া হচ্ছে নির্দেশনা।

কর্মসূচির মাধ্যমে দল চাঙ্গা রাখতে আওয়ামী লীগেও নির্দেশনা এসেছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে মাঠে ও ভোটে সরব একসময়কার প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল বিএনপি।

 উপনির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রচারণায় মাঠে থাকার কথা জানিয়েছে ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্ট। বিভিন্ন ইস্যুতে আবারো প্রেস ক্লাবে দৃশ্যত বাম দলগুলো। ভোটের রাজনীতিতে টিকে থাকতে জাতীয় পার্টিতেও দেয়া হয়েছে নতুন বার্তা। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে সফর বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অন্যান্য ইসলামী দলগুলোও কার্যক্রম চালাচ্ছে আগের মতো। গণফোরামে চলছে সম্মেলনের প্রস্তুতি।

দীর্ঘদিন করোনার কারণে রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধ ছিলো। বন্ধ করে দেয়া হয় দলগুলোর রাজনৈতিক কার্যালয়। সভা-সমাবেশ থেকে শুরু করে ঘরোয়া— সকল প্রকার আয়োজন একেবারেই থেমে যায়। এখন ফের পুরনো রূপে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে সব দল।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ আমার সংবাদকে বলেছেন, ‘করোনা, বন্যা ও আম্ফানে দেশের প্রত্যেক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিশ্চিত করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আওয়ামী লীগসহ প্রতিটি ইউনিটের নেতাকর্মীরা কাজ করছেন।

করোনায় মানবিক কারণে আওয়ামী লীগ ও বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কাজেই করোনাকালে সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে ছিলেন এবং আগামীতেও থাকবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক তৎপরতায় ফিরলেও করোনায় নৌকার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। দলে নির্দেশনা এসেছে, আমরা ফের মাঠে নামছি।’   

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেছেন, ‘করোনার কারণে দীর্ঘদিন পর মাঠের রাজনীতি ফিরছে। দেশের জনগণ আগে যেভাবে বিএনপির পাশে ছিলো, এখনো সেভাবেই আছে।

কারণ বর্তমান  দেশে বিএনপিই একমাত্র রাজনৈতিক দল। আর কোনো রাজনৈতিক দল নেই। একটি গোষ্ঠী দেশ পরিচালনা করছে। আমরা মাঠে নামছি, জনগণ আমাদের পাশে থাকবে।’বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আমার সংবাদকে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা জনসম্পৃক্ততা ছাড়া থাকতে পারেন না।

তাই করোনাকালেও সাধারণ মানুষের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলাম। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত অসহায় মানুষের খোঁজখবর নেয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়েছে। ফলে জনগণের সাথে আমাদের শতভাগ সম্পৃক্ততা আগেও ছিলো, এখনো আছে।’

কর্মসূচির মাধ্যমে দলকে চাঙ্গা রাখতে আ.লীগে নির্দেশনা : চলতি মাস থেকেই আওয়ামী লীগে সংগঠনের স্থগিত কার্যক্রম আবার সচল হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সমপ্রতি দলের একটি অনুষ্ঠান থেকে সকল নেতাকর্মীকে নির্দেশনা পৌঁছে দিয়েছেন।

সমপ্রতি দলের সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের দুই অংশ এবং সম্মেলন হওয়া পাঁচ সহযোগী সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রে জমা দেয়ার নির্দেশ দেন তিনি। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা-উপজেলা শাখা সম্মেলনের কার্যক্রম শুরুর নির্দেশও দেয়া হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে বলা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ মাসে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে জেলা-উপজেলার সম্মেলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিজ নিজ বিভাগের কোন্ কোন্ জেলায় সম্মেলন হয়নি তার তালিকা করতে বলা হয়েছে। কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সেগুলোর তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

টিকে থাকার লড়াইয়ে মাঠে ও ভোটে সরব বিএনপি : টিকে থাকার লড়াইয়ে মাঠে ও ভোটে সরব হচ্ছে বিএনপি। অংশ নিচ্ছে উপনির্বাচনগুলোতেও। দলের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দলকে চাঙ্গা করতে নির্বাচনমুখী হওয়ার বিকল্প নেই। তৃণমূলে দলের সাংগঠনিক শক্তি পোক্ত করতে স্থানীয় সব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বিএনপি। একযুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে রয়েছে দলটি।

তবুও নেতাকর্মীরা দল ছেড়ে চলে যায়নি, খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের নেতৃত্বে  দুঃসময়ে দলে ভাঙন সৃষ্টি হয়নি, সাময়ীক দুঃসময়েও ধানে পোকা ধরেনি; যৌথভাবে বিএনপির নেতৃত্বে দল-জোটের সবাই ঐক্যবদ্ধ আছে বলে দাবি করেছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। বিএনপির মিটিং-মিছিলে এখন আর কাউকে ভাড়া করে আনতে হয় না, সবাই নিজ উদ্যোগে চলে আসে।

কূটনীতিকরা জাতীয় স্বার্থে বিএনপির সঙ্গে এখন নিয়মিত বসছেন। দীর্ঘ করোনার সময়ে দলটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা কর্মসূচি পালন করেছে। সাময়িক ইস্যুতে সরব থেকে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়।  এখন সাংগঠনিকভাবে দলকে নতুনভাবে সাজাতে আরো বেশি কাজ করে যাচ্ছে।

ভোটের রাজনীতিতে টিকে থাকতে জাপায় নির্দেশনা : ভোটের রাজনীতিতে টিকে থাকতে জাতীয় পার্টিতে নতুন করে কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে। দলের অতিরিক্ত মহাসচিবদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা তৈরি করেছে বিরোধী দলটি।  

এক সভায় জাতীয় পার্টি মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, ‘জাতীয় পার্টি এখন আরও ঐক্যবদ্ধ। আগামী দিনের রাজনীতিতে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাতীয় পার্টি মাঠে থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘দলকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে এমন জেলাগুলোতে সম্মেলন করার নির্দেশ দেন বাবলু।

তিনি বলেন, ‘জাপা করোনার মধ্যে পিছিয়ে নেই। আমরা দলকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছি। আস্তে আস্তে জেলা-উপজেলার সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত হবে। আমরা মাঠে নামবো। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে শক্তিশালী করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীদের প্রচারণায় থাকবে ঐক্যফ্রন্ট : আসনে অনুষ্ঠিতব্য উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীদের ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সমর্থন জানানো ও প্রচারে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে।

এছাড়া গণফোরামের সম্মেলনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন দল গণফোরাম। কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে জেলা-উপজেলা কমিটির সম্মেলন শেষ করতে চায় গণফোরাম। পাশাপাশি সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে  দলের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘অন্যান্য দলের মতো আমরাও মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছি। অনেকদিন করোনার কারণে কোনো কর্মসূচি নেই। তাই সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে একটি সভার চিন্তা করছেন শরিক নেতারা। যত দ্রুত সম্ভব এ বৈঠক আহ্বান করা হতে পারে ড. কামাল হোসেনের মতিঝিলের চেম্বার অথবা শরিক নেতা আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসায়।’

কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে সফর বাড়িয়েছে জামায়াত : শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির পর দুঃসময়ে রয়েছে জামায়াত। এর মধ্যে নিজের ঘর থেকে সৃষ্টি হয় আলাদা সংসার। জনআকাঙ্ক্ষা নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠন হয়েছে। দুই মিলে তৃণমূলসহ সর্বমহলে স্থবিরতা দলটিতে।

এর মধ্যে প্রায় দীর্ঘ পাঁচ মাস করোনা ভাইরাস। তবে ঘরে থেকে ভার্চুয়ালে দলীয় কার্যক্রম চালানো হয়েছে। দলটির সাংগঠনিক নিয়মিত বড় একটি কর্মসূচি থাকে। দলের শীর্ষ নেতারা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে সফর করেন।

করোনার মধ্যে হাইকমান্ডের নির্দেশে এটি সীমিত ছিলো। তবে এখন ফের পুরনো ধরনের সফর বাড়িয়েছে। দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দলের গঠনতন্ত্রসহ নানা জটিলতা নিরসনে সব ধরনের কর্মসূচি রুটিন অনুযায়ী চলছে।

বিভিন্ন ইস্যুতে আবারো প্রেসক্লাবে মানবন্ধনে সরব বাম দলগুলো : বিভিন্ন ইস্যুতে আবারো প্রেস ক্লাবে দৃশ্যত বাম দলগুলো। কয়েকজন মিলেই একটি ব্যানার নিয়ে আগের মতোই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কিছুটা সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করলেও আগের মতোই বিবৃতিনির্ভর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দল বিকল্পধারা।

গণতন্ত্রী পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, নাগরিক ঐক্যসহ ছোটখাটো বাম দলগুলোর বেশির ভাগই আগের মতো প্রেস রিলিজ-নির্ভর কার্যক্রম চালাচ্ছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিভিন্ন ইস্যুতে মাঝে মধ্যে বাম দলগুলোকে সীমিত আকারে সভা-সমাবেশ করতে দেখা যাচ্ছে।

স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রমে ফেরার চেষ্টা করছে রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন দল-ওয়ার্কার্স পার্টি। একই ধারায় চলছে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অপর শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)।

আমারসংবাদ/এআই