বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০

১৩ কার্তিক ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ২৫,২০২০, ১২:১৩

সেপ্টেম্বর ২৫,২০২০, ১২:১৩

করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা!

আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও বিচার-সংশ্লিষ্টদের জোরালো দাবির প্রেক্ষিতে খুলে দেয়া হয় আদালত। নির্দেশনা দেয়া হয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলারও। বিচারাঙ্গনে জটলা কমাতে প্রশাসনের নজরদারিও রয়েছে। তবুও কমছে না আদালতের ভিড়।

স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই বিচারপ্রার্থীদের। কেউই মানছে না সামাজিক দূরত্বও। ফলে আদালতে বিচারপ্রার্থীদের মাঝে নতুন করে বাড়ছে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হার। আইনজীবী-মানুষ-পুলিশে একাকার আদালতপাড়া। করোনা ভাইরাসের কথা যেনো কারো মনেই নেই। এমনই একজন রাসেল মিয়া।

গতকাল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা মামলায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন টাইব্যুনালে  হাজিরা দিতে এসেছিলেন তিনি। আদালতে হাজিরা দেয়ার আগে করেছেন ঘোরাঘুরিও। বাসায় ফিরে এর পরদিনই জ্বর। সন্দেহবশত করালেন করোনা টেস্ট। রিপোর্টে কোভিড-১৯ পজেটিভ। একই রিপোর্ট আসে স্ত্রী, এক মেয়ে এবং ড্রাইভারেরও।

শুধু রাসেল মিয়াই নন, সারা দেশের আদালতগুলোতে হাজিরা দিতে এসে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে নিয়মিতই। আদালতকেন্দ্রিক জটলা কমাতে নেই কোনো ব্যবস্থাও। জেলা আদালতগুলোতে নেই হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও সামাজিক দূরত্ব মানাতে নজরদারিও।

আর সরকার নির্দেশিত ‘স্বাস্থ্যবিধি মানার আকুতিকেই যেনো কটাক্ষ করছে আদালত ভবনে আগতরা। অধিকাংশের মুখেই মাস্কের বালাই নেই। যাদের মুখে মাস্ক রয়েছে তাও নেমে এসেছে থুঁতনিতে। অনেকেই মাস্ক হাতে নিয়েই ঘুরছেন। সামাজিক দূরত্ব, করোনা, মহামারি, সংক্রমণ, কোভিড-১৯ পজেটিভ, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, কোয়ারেন্টাইন, মৃত্যু এসব বিষয় যেনো আদালতপাড়ায় অবান্তর।

সশরীরে আদালতে আসায় করোনা আক্রান্ত হয়েছেন জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলামও। বিচারিক আদালত থেকে ‘ভার্চুয়াল’ তুলে দেয়ার পর করোনা আক্রান্তের হার এখন আর হিসাবের মধ্যে নেই।

আদালত অঙ্গনে আসা বিচারপ্রার্থী, বিচারক, আইনজীবী, আইনজীবী সহকারী, আদালত সহায়ক কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও এখন পড়েছেন করোনা ঝুঁকিতে। নিয়মিত আদালত খুলে দেয়ার পর এ ঝুঁকি এখন মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। বিশ্লেষকেরা বলেন, নিয়মিত আদালতের পাশাপাশি ভার্চুয়াল আদালতের কোনো অপশন নেই।

ফলে প্রবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আদালতে আসতে হচ্ছে ভুক্তভোগী শ্রেণিপেশার মানুষকে। যে মানুষটি টানা সাত মাস বাসায় এক প্রকার কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন— মামলার প্রয়োজনে তাকেও হাজির হতে হচ্ছে আদালতে। দেশের প্রায় সব অফিস-আদালত-দপ্তরে ভার্চুয়াল সুবিধা সমপ্রসারিত হচ্ছে।

অথচ আদালত ভার্চুয়াল সুবিধা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কতিপয় পেশাজীবীর দাবির প্রেক্ষিতে খুলে দেয়া হয়েছে নিয়মিত আদালত। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবন-মরণ প্রশ্ন যেনো এখানে তুচ্ছ। আইন পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত পেশাজীবীদের জীবিকাই যেনো বেশি গুরুত্ব পেলো। করোনা সংক্রমণ রোধে যা ‘আত্মঘাতী’ বলে মনে করেন তারা।

ঢাকা বারের অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘করোনা সংক্রমণ রোধে ভার্চুয়াল-রেগুলার দুটোর অপশনই থাকতে পারতো। যেমনটি আছে উচ্চ আদালতে। সেটি না থাকায় মামলা সংশ্লিষ্টদের সশরীরে আদালতে আসতে হচ্ছে। মানুষ করোনা ঝুঁকিতে নিপতিত হচ্ছেন।’

তিনি জানান, করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষ একটি সার্কুলার জারি করেই যেনো দায় সেরেছে। কিন্তু কেউ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন না করলে কি হবে, কে এটি প্রতিপালনে বাধ্য করবে— তা স্পষ্ট নয়। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালিত হচ্ছে কি-না, সেটিও দেখার কেউ নেই।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের স্পেসাল অফিসার সাইফুল  ইসলাম বলেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে আদালতগুলোতে।

স্বাস্থ্যবিধি মানছে না আমার হাতে এ মুহূর্তে এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই যে, আপনাকে কিছু বলতে পারবো। এটুকু বলতে পারি, আমরা আদালতগুলোতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার জন্য সার্কুলার জারি করেছি।

সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকরা স্বাস্থ্যনির্দেশিকা নিশ্চিত করবেন। নিয়মিত আদালত খুলে দেয়ার পর আমরা এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঢাকার আদালতপাড়ায় সরেজমিন দেখা যায়, নিয়মিত আদালত চালুর পর সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। অনেকেই করোনা আক্রান্তের খবর গোপন করে আদালতে আসছেন। তাদের কাছ থেকে বিচারপ্রার্থী এবং অন্যরা দ্রুতই সংক্রমিত হচ্ছেন।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হোসেন আলী খান হাসান বলেন, বারের পক্ষ থেকে আমরা কিছু বিধি-বিধান করেছি। মাস্ক ছাড়া কেউ আদালত অঙ্গনে প্রবেশ করতে পারবেন না।

অবাঞ্ছিত ভিড় এড়াতে আইনজীবীদের আইডি কার্ড ঝোলানো বাধ্যতামূলক করেছি। টয়লেট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে। সাবানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা আছে। এর বেশি আমাদের কিই বা করার আছে? সরকারই তো সব ‘স্বাভাবিক’ করে দিয়েছে।

তিনি জানান, ঢাকা বারে ২৭ হাজার আইনজীবী। এরই মধ্যে ২৫ জনের বেশি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। কত শত আক্রান্ত হয়েছেন তার হিসাব নেই। ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় বিচার কার্যক্রমে আইনজীবীরা অভ্যস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এ ব্যবস্থাকে আরও ব্যাপকভিত্তিক এবং স্থায়ী রূপ না নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। ভার্চুয়াল পদ্ধতির বিপক্ষে আইনজীবীরাই আন্দোলনে নামেন। তাদের যুক্তি- না খেয়ে মরার চেয়ে, খেয়ে মরা ভালো।

ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। শুধু আইনজীবী কেন, বিচারক, বিচারপ্রার্থী,সব শ্রেণির মানুষই এখন গণহারে করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। অসহায়ের মতো চেয়ে থাকা ছাড়া আমাদের কিই বা করার আছে! এখানে জীবনের চেয়ে জীবিকা গুরুত্ব বেশি!

এদিকে আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন আদালতের ৪৬ জন বিচারক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। ১৭৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আক্রান্ত। এদের মধ্যে একজন বিচারক ইন্তেকালও করেছেন। সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবী ইন্তেকাল করেছেন ৪৩ জনের বেশি। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

সুপ্রিম কোর্ট বার সূত্র জানায়, সারা দেশের আদালত পরিচালিত সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের অধীনে। করোনা সংক্রমণ ক্রমঃবিস্তারের প্রেক্ষাপটে বিধি সংশোধন করে সারা দেশে ভার্চুয়াল আদালত চালু করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে ভার্চুয়াল আদালতে সানন্দে গ্রহণ করেন তরুণ প্রজন্মের আইনজীবীরা। ভার্চুয়াল আদালতে শুনানি করতে পারেন— এমন আইনজীবীদের কাছে মামলা নিয়ে ভিড় জমান বিচারপ্রার্থীরা। পক্ষান্তরে প্রযুক্তিনির্ভর এ বিচার পদ্ধতির প্রতি অনীহা দেখান সিনিয়র আইনজীবীরা। বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশই ওয়েব ক্যাম চালানো দূরে থাক- টাচ মোবাইলও চালাতে জানে না।

এদিকে আদালত নিয়মিতকরণসহ সব কিছু খুলে দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘আদালতে মানব জট করোনা সংক্রমণের বড় কারণ হতে পারে। এটি আমাদের বাস্তব সমস্যা। এসব দেখভাল করার দায়িত্বে নিয়োজিত ভলান্টিয়ারদের সক্রিয় হতে হবে। আদালতে যারা উপস্থিত হচ্ছেন— সেই জনসাধারণ যেনো স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে বাধ্য হন— সরকারকে সেই পদক্ষেপ নিতে হবে।’

আমারসংবাদ/এসটি