বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০

৫ কার্তিক ১৪২৭

ই-পেপার

আবদুর রহিম

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ২৭,২০২০, ১২:৩০

সেপ্টেম্বর ২৭,২০২০, ১২:৩০

তিন লোভে ভিপি নূর

খালেদা জিয়ার অন্তরালে বিএনপি প্রায় মরে গেছে। ভোটের ঘুঁটি জাতীয় পার্টিও সরকারের প্রেশক্রিপশনে চলায় মানুষের আস্থা নেই। বাম রাজনীতিও আগের আদর্শের অবস্থানে নেই। শীর্ষ নেতাদের হারানোর পর আলোচিত সমালোচিত জামায়াতের কর্মকাণ্ডও আলোচনাহীন।

গণতন্ত্রের দেশে রাজনীতি প্রায় মৃত। দেশের মানুষ ও প্রবাসীরাও চলমান রাজনীতি নিয়ে অসন্তোষ। এ পরস্থিতিতে হঠাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি নূরুল হক নূর রাজমাঠে আলোচনায়। এটিকে দেশের রাজনীতিতে চোখ রাখা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রাজনীতির ‘নয়া বিষ’ বলে মনে করছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, ভিপি নূর কারো ‘পেইড এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করছে। বিএনপির ব্যাকআপ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ভিপি নূর কারো জন্যই বার্তা নিয়ে আসবে না মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মৌলিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যারা জনগণের কাজ করছে সেটিও বাঁধাগ্রস্ত হবে।

দীর্ঘ সময় রাজনীতির বিষয়ে চোখ রাখা এক বিশ্লেষক আমার সংবাদকে বলেন, মূলত ভিপি নূরকে ব্যাকআপ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

এটিকে দুদিক থেকেই দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। ক্ষমতাসীন সরকার ভিপি নূরের আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করবে দেশে গণতন্ত্র আছে, বাকস্বাধীনতা আছে।

অন্যদিকে দীর্ঘ সময় যারা বিএনপি থেকে কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না এমন ব্যক্তিরাও নূরকে আলোচনায় রেখে বিএনপির জনপ্রিয়তা আরও নষ্ট করার চক্রান্ত হয়তো করছে। আর এটি করছে বিএনপির যেসব বুদ্ধিজীবী রয়েছে তারাই। সঙ্গে জামায়াতও পেছনে রয়েছে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপি বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় আছে। এটিকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে নূর।

সরকারের বিরোধী হয়ে কৌশলে বিএনপির কাছে প্রিয়। অন্যদিকে নেতৃত্বহীন বিএনপিকে আরও সংকটে ফেলতে এজেন্ডাও রয়েছে। অনেকে মনে করছেন ড . কামাল হোসেনকে দিয়ে সরকার ভোটের আগে রাজমাঠ হালাল করলেও এখন শূন্য মাঠে কাউকে প্রয়োজন। তাই নূরের সরকারবিরোধিতা গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক হচ্ছে বলে মনে করছেন স্বয়ং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একটি অংশও।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক  আমার সংবাদকে বলেছেন, আজ অনেকেই বলেন, দেশে বাক স্বাধীনতা নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ তথা বর্তমান সরকার রাজনৈতিকভাবে দেশের কারো বাক স্বাধীনতা হরণ করেনি।

মূলত যারা বলেন, দেশে বাক স্বাধীনতা নেই, তারা সবাই জনবিচ্ছিন্ন। দেশের জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই ভিপি নূর সরকারবিরোধী কথা বলেন। দেশে যে বাকস্বাধীনতা আছে ভিপি নূর তার জ্বলন্ত উদাহরণ। সমপ্রতি ধর্ষণের মামলা হওয়ার পর আটকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ ছেড়ে দেয় নূরকে।

এ নিয়ে নূরের ভাষ্য— আক্রমণ করা হলো, কেন গ্রেপ্তার করা হলো? আবার কেনই বা ছেড়ে দেয়া হলো? রাষ্ট্রযন্ত্রের কারো সাথে কারো মিল নাই, একজন মারে-ধরে, আরেকজন ছেড়ে দেয়। আমি আগেও বলেছি, এদেশে বিচার নাই, আইনের শাসন নাই, গণতন্ত্র নাই। এরপর নূরের বিরুদ্ধে একই ঘটনায় আরও একটি মামলা হয়েছে।

এই মামলায় ধর্ষণ, অপহরণ ও ফেসবুকে খারাপ পোস্ট দিয়ে প্রচার করাসহ তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। রাজনীতিতে এখন আলোচনার নাম ভিপি নূর। এছাড়া ভিপি নূর গত ১১ জুন তরুণদের নিয়ে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।

ওই সময় নূর বলেন, আমি আওয়ামী লীগ, বিএনপির রাজনীতি করিনি, করবো না। আমরা একটি নতুন ধারার রাজনৈতিক দল গঠন করতে কাজ করছি। নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্দেশ্যে যুব, শ্রমিক ও প্রবাসী অধিকার পরিষদ গঠন করেছি।

নূরুল হক নূর বলেন, এখানে লুকোচুরির কিছুই নেই। আমরা তরুণদের নেতৃত্বে একটা নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করতে চাই। যারা নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি করতে চায়, পজেটিভ চিন্তা করে নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করার জন্য আমি তাদের সাথে প্রয়োজনে মিলেমিশে কাজ করতে চাই। আর যদি সেরকম কাউকে না পাই তবে একাই এগিয়ে যাবো।

তিনি বলেন, রাজনীতি করতে প্রয়োজন ত্যাগ ও ইচ্ছা। বিশাল অর্থের প্রয়োজন নেই এখানে। ইচ্ছা থাকলে মানুষ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।

এ বিষয়ে গতকাল সর্বশেষ আপডেট জানিয়ে নূর বলেন, রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রক্রিয়া চলমান জানিয়ে ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরুল হক নূর জানিয়েছেন, দল গঠনের কাজ ৭০ ভাগ শেষ। এ বছরের শেষেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। আমরা দেখেছি যে, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোতে যেটা হয়; একটি বড় মিছিলে ১০-১৫ জন পুলিশ হুইসেল দিলে অনেকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের নেতাকর্মী রয়েছে তারা সংখ্যায় অল্প কিন্তু সবাই ডেডিকেটেড। একেবারে শেষ পর্যন্ত থাকে। কাউকে ভয় পায় না।

তবে নূরের বেশকিছু বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ। তাদের মতে, নূরকে এখন টেলিভিশনের পর্দা ছাড়া দেখাই যায় না। চলাফেরাও করেন গাড়িতে করে। পোশাকেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। কোটা আন্দোলনের সময়ে নূরের জামা আর এখনকার জামা দেখলেই তা অনুধাবন করা যায়। নতুন রাজনৈতিক দল করার ঘোষণাও দিয়েছে, সেখানেও বলছেন টাকা কোনো বিষয় না। ফলে সবকিছু মিলিয়ে নূরের টার্গেট কি-এটা যেন অনেক খানিই পরিষ্কার।

ক্যাম্পাসে বাম ধারার রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট একজন জানান, ডাকসু ভিপির সম্মান বা মর্যাদা অনেক। কিন্তু তার কাজ তো জাতীয় রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করে, ‘সস্তা আলোচনা’য় আসা হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করবেন তিনি। শিক্ষার্থীদের অভাব, অভিযোগ বা দাবি-দাওয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তুলে ধরবেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, তবে নূর হয়তো অনুধাবন করতে পেরেছে পূর্বেকার ডাকসু ভিপিরা জাতীয় রাজনীতিতে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। তাই হয়তো তিনি একেবারে জাতীয় রাজনীতিতেই নামতে চাইছেন।

তবে প্রশংসাও পাওয়া যাচ্ছে। নূরকে নিয়ে আল মামুন নামে একজন বলেন, ভাই দেশে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা ভাষানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান একজন করেই ছিলো। আর আপনি বর্তমান সময়ের একজন গ্রেট নেতা যার দিকে জাতি তাকিয়ে আছে চাতক পাখির মতো। ভাই আমি কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত নই, তবে আপনার অপেক্ষায় আছি যদি কোনোদিন সুযোগ হয় আপনার সাথে থাকবো।

মাহমুদুল হাসান ইমরান বলেন, লোভে না পড়লে সে সফল হবে। কারণ নূরের মধ্যে বারবার মার খেয়েও টিকে থাকার ধৈর্য এবং পুনরায় উঠে দাঁড়াবার দম আছে, যে জিনিসটি অন্যদের নেই। শুধু রাজনৈতিক দল নয় প্রবাসীদের নিয়েও কাজ করছেন নূর। অভিযোগ রয়েছে উস্কানিরও।

ভিপি নূরুল হক নূরের সংগঠন প্রবাসী অধিকার পরিষদের বিরুদ্ধে প্রবাসে বাংলাদেশিদের উস্কানি দেয়ার অভিযোগ তুলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন সমপ্রতি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘তারা (২৭ বাংলাদেশি) ভিডিও মারফত আন্দোলন শুরু করেছে যে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো আক্রমণ করবে। এদের নেতৃত্ব দিচ্ছে একটা নতুন প্রতিষ্ঠান। এটার নাম হচ্ছে প্রবাসী অধিকার পরিষদ। এর প্রধান সম্ভবত ঢাকা ইউনিভাসির্টির সাবেক ভিপি নূর সাহেব।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ডাকসু নির্বাচনে তার কাছে ছাত্রলীগ প্রার্থীর পরাজয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কার্যত কোনো বিরোধী ছাত্র সংগঠন নেই। অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কার্যত নিষ্ক্রিয় কিংবা অনেকের ভাষায় ‘অস্তিত্বহীন।’ এমন প্রেক্ষাপটে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রতি নূরুল হক নূর কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে সফল হয়েছেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলন সফল হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে ‘গেস্ট-রুম’ ‘গণ-রুম’ ও ছাত্রলীগ নেতাদের সালাম দিয়ে চলার যে সংস্কৃতি ছিলো সেটি অনেকটা কমে এসেছে। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে কেউ তেমন সক্রিয় হতে পারছে না বা সক্রিয় হওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের নেই, এখন নূরকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ ও বিরোধিতা দানা বাঁধছে।

আমারসংবাদ/এসটিএম