বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০

৫ কার্তিক ১৪২৭

ই-পেপার

আবদুর রহিম

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ২৯,২০২০, ১২:২৬

সেপ্টেম্বর ২৯,২০২০, ১২:২৬

ভদ্রবেশী ভণ্ডদের ভাবনার রায়

অস্ত্র মামলায় রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকার এক নম্বর মহানগর স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশ এ রায় দেন।

মামলায় সাহেদকে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯(ক) ধারায় যাবজ্জীবন ও (চ) ধারায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। দুটি সাজা একত্রে চলবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেশের বুদ্ধিজীবী মহল।

তারা বলেন, এ ধরনের ঘটনার রায় এমনি তাড়তাড়ি হওয়া উচিত। অপরাধীদের জন্য এ ধরনের বিচারের রায় অবশ্যই ভালো। রাষ্ট্রের জন্য মানুষের আস্থার জন্য নজির হয়ে থাকবে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুরক্ষার জন্য এ ধরনের বিচার খুব তাড়াতাড়ি হওয়া উচিত, তাই হয়েছে। ভদ্রবেশী এমন ভণ্ড বা অপরাধীরা দ্বিতীয়বার কোনো অপরাধ করতে চিন্তা করবে। যারা এ ধরনের অপরাধ করবে তাদের জন্য বার্তা হয়ে থাকবে।

এ সমস্ত অপরাধীরা দ্বিতীয়বার কোনো অপরাধ করতে চিন্তা করবে। আমরা সব সময় আশা করবো অপরাধীদের বিচার যাতে বিলম্বিত না হয়। বিচার যদি বিলম্বিত হয় তাহলে বিচারপ্রার্থীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। প্রকৃত দোষীরা আরও ঘটনার সাহস পাবে। এর সঙ্গে বাংলাদেশে আরও বড় বড় ঘটনা ঘটছে বিশেষ করে ধর্ষণ। এগুলোর রায়ও খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে হওয়া উচিত।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দাবি, এখনো প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারের অপেক্ষাধীন। তারা আশা করছেন, এগুলোও যেনো খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে রায় দেয়া হয়।

এদিকে আদালতে উপস্থিত সাহেদ রায় শুনে অনেকটাই নিবির্কার ছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন। তবে আসামির আইনজীবী মো. মনিরুজ্জামান বলেছেন, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।

সাহেদ করিম তার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, তিনি ন্যায়বিচার পাননি। রায় ঘোষণার পর সরাসরি তাকে প্রিজন ভ্যানে নিয়ে যাওয়া হয়।

তখন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাহেদ বলেন, ‘আমি ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। ন্যায়বিচার পাইনি। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবো।’

রায় ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় সাহেদের আইনজীবী মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মামলাটির বিচার এত দ্রুত হচ্ছে, এটা নিয়ে আমরা আগে থেকেই আশঙ্কায় ছিলাম। সেই আশঙ্কাই আজ সত্য হলো। মামলাটি আমাদের ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এ রায়ে আমরা আমরা অসন্তুষ্ট, সংক্ষুব্ধ। উচ্চ আদালতে আপিল করলে আমরা ন্যায়বিচার পাবো। সেখানে আসামি খালাস পাবেন বলে বিশ্বাস করি।’

এদিকে রায়ে আসামির সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘এ মামলায় তাকে আমরা সর্বোচ্চ সাজা দিতে পেরেছি, এজন্য আমরা সন্তুষ্ট। সাহেদের বিরুদ্ধে অপর মামলাগুলো তদন্ত শেষে আদালতে এলে সেগুলোর দ্রুত বিচার শেষ করার চেষ্টা করবো।’

এই রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, আমাদের সমাজে সাহেদের মতো ভদ্রবেশী অপরাধীদের জন্য এই রায় একটি বার্তা।

মামলার বাদির জবানবন্দির বরাত দিয়ে আদালত বলেন, আসামি মাদক মামলায় হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার স্বীকারোক্তি মতে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথের পরিত্যক্ত গাড়ির পেছনের সিটের নিচ থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়। জব্দ তালিকার সাক্ষীও গাড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলেছেন। পরে তদন্ত কর্মকর্তার অনুসন্ধানে উঠে আসে ওই গাড়িটি সাহেদ কিস্তিতে কিনেছিলেন।

তিনি এতই চতুর যে অস্ত্রের কথা জানা সত্ত্বেও বিচার চলাকালে একবারও আদালতে তা স্বীকার করেননি। আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেছেন, এই অস্ত্রটি সাহেদের মালিকানায় ছিলো না এবং তিনি তা জানতেনও না। যে গাড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে তা সাহেদের নয়, এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিলো।

অথচ সাহেদ কিস্তিতে গাড়িটি কিনেছিলেন বলে তদন্তে প্রমাণিত হয় এবং তার কাছে সরবরাহ করা চাবি নিয়েই তালাবদ্ধ গাড়ির তালা খুলে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাই এতে প্রমাণিত হয়, অস্ত্র সম্পর্কে তিনি জানতেন ও তার মালিকানাধীন গাড়ি থেকেই তা উদ্ধার করা হয়।

সুতরাং এখানে তার অস্ত্র সম্পর্কে জানা থাকা ও মালিকানার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এছাড়া এই আসামি এতই ধুরন্ধর যে, মালিকানার বিষয়টি তিনি কখনো আদালতে স্বীকার করেননি। তাই তিনি এখানে কোনো অনুকম্পা পেতে পারেন না।

সবশেষ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, আমাদের সমাজে সাহেদের মতো ভদ্রবেশী অপরাধীদের জন্য এই রায় একটি বার্তা হিসেবে কাজ করবে। এরপর আদালত সাহেদের বিরুদ্ধে দণ্ডের ঘোষণা করেন। এই মামলায় সাহেদকে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯(ক) ধারায় যাবজ্জীবন ও (চ) ধারায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। দুটি সাজা একত্রে চলবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া ওই অস্ত্র বাজেয়াপ্ত ও যে গাড়ি থেকে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়েছে, তার মালিকানা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতেও বলা হয়েছে।

রিজেন্ট হাসপাতালে কোভিড-১৯ পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতির ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার মধ্যে গত ১৫ জুলাই ভোরে সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সাহেদকে। ওই মামলায় গোয়েন্দা পুলিশের রিমান্ডে থাকার সময় ১৮ জুলাই রাতে সাহেদকে নিয়ে উত্তরায় অভিযান চালিয়ে তার একটি গাড়ি থেকে গুলিসহ একটি পিস্তল এবং কিছু মাদক জব্দ করা হয়।

ওই ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় অস্ত্র আইনে এই মামলা করে পুলিশ। এরপর গত ৩০ জুলাই ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. সাইরুল ইসলাম।

গত ২৭ আগস্ট অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর পর এ মামলার কাজ এগিয়েছে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। রাষ্ট্রপক্ষে ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মোট ১১ জনের সাক্ষ্য শুনেছে আদালত। আসামি সাহেদ গত ১৬ সেপ্টেম্বর আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি দাবি করেন, যে অস্ত্রের কথা এ মামলায় বলা হচ্ছে, সেটা তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়নি।

এ নিয়ে কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ আমার সংবাদকে বলেন, অপরাধীদের জন্য এ ধরনের বিচারের রায় অবশ্যই ভালো। রাষ্ট্রের জন্য মানুষের আস্থার জন্য নজির হয়ে থাকবে। তবে এ ধরনের ঘটনা আরও বহু রয়েছে সেগুলোরও বিচার হওয়া উচিত।

আর তা হওয়া উচিত খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে। তাহলে যারা এ ধরনের অপরাধ করবে তাদের জন্য বার্তা হয়ে থাকবে। এ সমস্ত অপরাধীরা দ্বিতীয়বার কোনো অপরাধ করতে চিন্তা করবে। আমরা সব সময় আশা করবো অপরাধীদের বিচার যাতে বিলম্বিত না হয়। বিচার যদি বিলম্বিত হয় তাহলে বিচারপ্রার্থীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। প্রকৃত দোষীরা আরও ঘটনার সাহস পায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি হাফিজ উদ্দিন খান আমার সংবাদকে বলেন, রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের যে রায় হয়েছে তা খুবই ভালো। সন্তোষজনক রায় হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি রায় হয়েছে।

এ ধরনের ঘটনার রায় এমনি তাড়তাড়ি হওয়া উচিত। সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুরক্ষার জন্য এ ধরনের বিচার খুব তাড়াতাড়ি হওয়া উচিত, তাই হয়েছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশে আরও বড় বড় ঘটনা ঘটছে, বিশেষ করে ধর্ষণ। এগুলোর রায়ও খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে হওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন এ বিষয়ে আমার সংবাদকে বলেন, রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের মামলাটি ছিলো খুবই আলোচিত ঘটনা। শুধু দেশ নয়, দেশের বাইরেও এটি ছিলো আলোচিত।

আলোচিত ঘটনা বিধায় এটির রায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে হয়েছে। এ জন্য আদালত ও রাষ্ট্রকে সাধুবাদ জানাই। তবে আমরা এও দেখি এখনো প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারের অপেক্ষাধীন। আমরা আশা করবো এগুলোরও যেন খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে রায় দেয়া হয়।

আমারসংবাদ/এসটিএম